দিলীপ মজুমদার, কুমিল্লা
প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:২৮ পিএম
ড্রেজারের বালু উত্তােলনে কৃষকদের রক্ত-ঘামে আবাদ করা জমি দিনে দিনে পরিণত হচ্ছে গর্ত ও জলাশয়ে। বুধবার কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে তোলা। প্রবা ফটো
বছরের পর বছর ধরে কুমিল্লার মুরাদনগর, বরুড়া ও আশপাশের উপজেলাগুলোর উর্বর ফসলি জমি ধ্বংস করছে অবৈধ ড্রেজার সিন্ডিকেট। কৃষকদের রক্ত-ঘামে আবাদ করা জমি দিনে দিনে পরিণত হচ্ছে গর্ত ও জলাশয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি শুধু ব্যবসা নয়, বরং প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা ভয়ংকর এক সিন্ডিকেট। কারণ প্রশাসনের অভিযানের আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় কার্যত কেউ ধরা পড়ে না, অথচ দিনের পর দিন চালু থাকে মাটি কাটার মহোৎসব। এতে করে শুধু জমিই হারাচ্ছেন না কৃষকরা, বরং পেটের ভাত হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে হাজারো পরিবারে।
মুরাদনগর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে উপজেলার আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২৪,২৯৩ হেক্টর। ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ১৭,২৯৩ হেক্টরে। অর্থাৎ গত ৭ বছরে বিলীন হয়েছে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর বা ১৭.৩ হাজার একর জমি। গড়ে প্রতিবছর হারাচ্ছে প্রায় ২,৫০০ একর আবাদি জমি।
উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাকিব হাছান খান জানান, গত কয়েক মাসে ৩০০টিরও বেশি ড্রেজার ধ্বংস করা হয়েছে এবং জরিমানা আদায় হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। তবে অপরাধীদের হাতেনাতে ধরতে না পারায় মামলা করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবদুর রহমান বলেন, আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু অভিযানের সময় স্পটে কাউকে পাওয়া যায় না। ড্রেজার পাইপ পেলে ভেঙে দিচ্ছি, কিন্তু বাড়ি থেকে তুলে আনার এখতিয়ার আমাদের নেই।
তার মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভুক্তভোগীদের উচিত ক্ষতিপূরণের দাবিতে নিয়মিত মামলা করা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, অভিযান হয়, জরিমানা হয়। কিন্তু অপরাধীরা ধরা পড়ে না। বছর শেষে দেখা যায়, হাজার হাজার একর জমি গায়েব। মুরাদনগর, বরুড়া ছাড়াও চান্দিনা, দেবিদ্বার, ব্রাহ্মণপাড়া, বুড়িচংসহ বিভিন্ন উপজেলায় কৃষিজমি গিলে খাচ্ছে মাটিখেকো ড্রেজার সিন্ডিকেট। প্রশাসনের চোখের সামনে এমন দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ না হলে অচিরেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা হারাবে কুমিল্লার বিস্তীর্ণ কৃষি এলাকা।
বুধবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, মুরাদনগরের ২০০টিরও বেশি গ্রামে ৭৬টি সক্রিয় স্থানে চলছে ড্রেজারের কার্যক্রম। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের মধ্যে রয়েছে বি-চাপিতলা, এলখাল কোরবানপুর, কামাল্লা সোনাকান্দা, ইউসুফনগর, যোগেরখিল ও কামাল্লা।
কৃষক জামাল হোসেন বলেন, ড্রেজারের পাইপ বসানোর পর আমার এক বিঘা জমি এক রাতেই ধসে গেছে। ফসলের স্বপ্ন দেখারও সুযোগ পেলাম না। কৃষক হিরন মিয়ার অভিযোগ, জমি চাষ করতে যাই, দেখি সব গর্ত আর ধস। বাধ্য হয়ে জমি অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হয়েছে।
কামাল উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দিনে প্রশাসন আসে, ছবি তোলে, মেশিন ভাঙে কিন্তু রাতে আবার ড্রেজার চলে। মনে হয় সবাই মিলে খেলায় মেতেছে।’
ড্রেজার ব্যবসায়ী হারুন মুন্সীর স্বীকারোক্তি আরও চাঞ্চল্যকর। তিনি বলেন, ‘আগে প্রতি প্রজেক্টে দেড়-দুই লাখ টাকা লাভ হতো। এখন মেশিন বসালেই রাজনৈতিক নেতা, নায়েব সাব, সাংবাদিক সবাইকে টাকা দিতে হয়। না দিলে ব্যবসা চলে না।’
এ বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া ছাড়া এই ড্রেজার সিন্ডিকেট টিকে থাকা সম্ভব নয়।
মুরাদনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পাভেল খান পাপ্পু বলেন, ড্রেজার দিয়ে জমি নষ্ট করায় উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। জমি বাঁচাতে হলে ড্রেজার বন্ধ করতেই হবে।
বরুড়া উপজেলার গালিমপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, বিশাল ফসলি মাঠের মাঝখানে ৩০-৪০ ফুট গভীর গর্ত ও জলাশয়। জানা গেছে, খাস খতিয়ানভুক্ত ৬০ শতক জমি হাতবদল হয়ে একপর্যায়ে পড়ে ড্রেজার ব্যবসায়ীদের হাতে। এতে এ সিন্ডিকেটটি ড্রেজার বসিয়ে প্রায় ৩০-৪০ ফুট গর্ত করে মাটি বিক্রি করে তারা অর্ধলাখ টাকা আয় করলেও চারপাশের কৃষকের জমি বর্ষায় ভেঙে তলিয়ে গেছে।
স্থানীয় কৃষক জয়নাল আবেদীন বলেন, সমাজের প্রভাবশালী মহল এটাকে একটা লাভবান ব্যবসায় রূপান্তর করলেও ড্রেজার আমাদের জন্য কাল হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের কোনো অনুমতিরও প্রয়োজন মনে করে না এরা। আবার প্রশাসনকে জানালেও আইনের কঠোর ব্যবহারও করা হয় না।
এ বিষয়ে বরুড়া উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, আমরা খবর পেলেই খোঁজ নিই। এ বিষয়ে প্রশাসনের মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আমাদের সহযোগিতা করার কথা। সামনে এসব বন্ধে মোবাইল কোর্টে করলে আমাদের আন্তরিক সহযোগিতা থাকবে।