মাওনা-কালিয়াকৈর সড়ক
রায়হানুল ইসলাম আকন্দ, শ্রীপুর (গাজীপুর)
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৭:৩৮ পিএম
আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৭:৪২ পিএম
মাওনা-কালিয়াকৈর সড়কটির দূরত্ব ৩২ কিলোমিটার। এ সড়কটি মাওনা চৌরাস্তা ও কালিয়াকৈর মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শাল-গজারি বনের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া সড়কটি প্রখর রৌদ্রে চালক ও যাত্রীদেরকে শীতল বাতাসের আবেশ মন জুড়িয়ে দেয়। কালিয়াকৈর বা মাওনা থেকে অল্প সময়ে আসা-যাওয়া করা যায়। ফলে যানজট এড়ানোর জন্য অনেক যাত্রী এ পথই বেছে নেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য পর্যটকরাও এ সড়ক ব্যবহার করেন।
তবে সড়কটির বাঁকে বাঁকে হাঁ-মুখ করে আছে মৃত্যুফাঁদ। এই বাঁকগুলোয় বহু দুর্ঘটনা ঘটেছে। সড়কের ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা।
শ্রীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং মাওনা চৌরাস্তার প্রাইভেট হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রোগীর ভর্তি ও মৃত্যুর ঘটনা থেকে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে এসব বাঁকে অর্ধশতাধিক দুর্ঘটনায় ১১ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক। আহতদের মধ্যে অনেকে হয়েছেন পঙ্গু। এসব দুর্ঘটনা রোধে দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
চলতি বছরের গত ২ আগস্ট সড়কের কালিয়াকৈরের চাপার ইউনিয়নের চেয়ারম্যানবাড়ী মোড়ে ট্রাক, অটোরিকশা ও মাইক্রোবাসের ত্রিমুখী সংঘর্ষে অটোরিকশার তিন যাত্রী গুরুতর আহত হন।
১৫ আগস্টর কালিয়াকৈরের ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের ৯২ নামক স্থানে দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী গৌরাঙ্গ চন্দ্র মণ্ডল (৪৮) মারা যান। তিনি মানিকগঞ্জ সদরের স্বল্প নন্দনপুন (বরুন্দী) গ্রামের তুষ্ট চরন মণ্ডলের ছেলে।
২১ আগস্ট মাওনা-কালিয়াকৈর সড়কের পাইকপাড়া স্ট্যান্ড এলাকায় একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে পড়ে গেলে চালক ও হেলপার গুরুতর আহত হন।
২৪ আগস্ট ওই সড়কের চেয়াম্যানবাড়ী মোড় এলাকায় মাছ বহনকারী পিকআপ সড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের গাছে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনায় পড়ে।
চলতি বছরের ১৪ জুন বদনীভাঙ্গা (মনসুরাবাদ) এলাকায় চলন্ত গাড়ির ধাক্কায় সড়কে ছিটকে পড়ে শিমলাপাড়া গ্রামের আহাম্মদ আলীর ছেলে মুরগির ব্যবসায়ী মোটরসাইকেলচালক হারুনুর রশিদ (৩৫) এবং আরোহী জাকির হোসেন (৩৮) মারা যান।
১৮ জুলাই দুপুরে বড়চালা এলাকায় কাভার্ডভ্যান ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের তিনজনসহ পাঁচজন মারা যান। নিহতরা হলেনÑ বগুড়ার ধুনট উপজেলার ঈশ্বরঘাট গ্রামের জাহিদুল ইসলাম, তার স্ত্রী নাসরিন আক্তার, ছেলে আবু হুরায়রা, যাত্রী শফিকুল ইসলাম ও অটোরিকশাচালক মেহেদী। জাহিদুল ইসলাম পরিবার নিয়ে শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পূর্বখন্ড গ্রামে ভাড়া থেকে নোমানশিল্প গ্রুপের নোমান হোম টেক্সটাইল কারখানায় চাকরি করতেন।
১৯ জুলাই ওই সড়কের চাপার সেতুর দক্ষিণ পাশে সড়ক পার হওয়ার সময় সিমেন্ট মিক্সার গাড়ির চাপায় উপজেলার শিমুলতলী গ্রামের রাদের ছেলে ওষুধ ব্যবসায়ী রোদ্র পাল (২৫) মারা যান। ১৫ ফেব্রুয়ারি সড়কের কারওয়ান বাজার এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় রাশেদ ও আবু বক্কর ছিদ্দিক নামের দুই ব্যক্তি মারা যান।
সরেজমিন দেখা যায়, মাওনা-কালিয়াকৈর সড়কে ২০টি ভয়ংকর বাঁক আছে। এসব বাঁকে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে। বেশিরভাগ বাঁকে সংকেত চিহ্ন নেই। যেটুকু সাংকেতিক চিহ্ন আছে, তাও অস্পষ্ট এবং দূর থেকে দেখা যায় না।
সিএনজিচালক জব্বার মিয়া বলেন, সড়কে গাড়ি ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলে। ইচ্ছা করলেই গাড়ি হঠাৎ করে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বাঁকগুলো এত ভয়ংকর যে এক পাশ থেকে অন্য পাশ দেখা যায় না। বাঁকগুলোয় যে নির্দেশক দেওয়া আছে, তা অস্পষ্ট এবং দূর থেকে দেখা যায় না। বিশেষ করে রাতের বেলা সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।
আরেক চালক কবির হোসেন বলেন, মূলত এ ধরনের বড় বাঁকে গ্রুসের (কনভেক্স মিরর) নির্দেশক স্থাপন করা উচিত, যাতে চালকরা দূর থেকে আসন্ন বাঁকের বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন দেখতে পারে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে যায়। সংকেত বাতি স্থাপন করা হলে সমস্যা থাকবে না।
সড়কটির মাওনা থেকে ফুলবাড়ীয়া পর্যন্ত ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে গাজীপুরে সওজের কার্যালয়। এর সহকারী প্রকৌশলী সোহেল মিয়া বলেন, সড়কের দুপাশে একশ মিটারের মধ্যে সংকেত বাতি স্থাপন করতে না পারলেও ডানে মোড়, বামে মোড় লিখে সিগন্যাল দেওয়ার দ্রুত ব্যবস্থা করা হবে। সড়কে স্পিডব্রেকার (গতিরোধক) দেওয়ার নিয়ম নেই আমাদের। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সড়কের ১৩ কিলোমিটারের ওই অংশের বাঁকগুলোর ঝুঁকি বিবেচনায় দুর্ঘটনা রোধে র্যাম্বেল স্ট্রিপ (ঘন ছোট গতিরোধক) দেওয়া হবে, যাতে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, যেসব এলাকার সড়ক নির্দেশক মুছে গেছে, সেগুলো দ্রুতই পুনর্নির্মাণ করা হবে।