তরিকুল ইসলাম মিঠু, যশোর
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:৩০ পিএম
বেনাপোল বন্দরে ফের বৈধ আমদানি পণ্যের মধ্যে অবৈধভাবে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে পণ্য আনছে বেপরোয়া পাচারকারী চক্র। প্রবা ফটো
বেনাপোল বন্দরে ফের বেপরোয়া পাচারকারী চক্র। বৈধ আমদানি পণ্যের মধ্যে অবৈধভাবে নিয়ে আসা পণ্য সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বেনাপোল বন্দর দিয়ে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
গত সোমবার সকালে পেট্রাপোলের কাস্টমস কর্মকর্তারা বিএসএফের সহযোগিতায় বেনাপোল বন্দর অভিমুখের ৫টি ট্রাকে থাকা এমন একটি পণ্য চালান জব্দ করেছে। এসব পণ্যের বাজার মূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে ভারতীয় কাস্টমস কর্মকর্তারা।
ভারত সরকারের অর্থনৈতিক গোয়েন্দা সংস্থা অ্যানফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) ও কাস্টমস যৌথভাবে আটক ট্রাকগুলোর মালামাল খতিয়ে দেখছে। বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে গতকাল বুধবার জানাজানি হলে তোলপাড় শুরু হয় দুদেশের বন্দরে।
বন্দরে ভারতীয় রপ্তানিপণ্য জব্দের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে দুদেশের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে দুদেশের আমদানি-রপ্তানিকারকদের মধ্যে। ব্যবসায়িক মহল আশঙ্কা করছেন অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে ভারতীয় পেট্রাপোল বন্দরে এই রপ্তানিপণ্য জব্দের ঘটনায় অন্যান্য পণ্যের কড়াকড়ি বাড়বে।
ভারতের পেট্রাপোল ব্যবসায়ী সূত্রে জানা যায়, এই পণ্যের বাংলাদেশের মালিক আমদানিকারক হাসানুজ্জামান হাসান। দীর্ঘদিন ধরে হাসানুজ্জামানের মালিকানাধীন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স জামান ট্রেডার্স বাংলাদেশে রপ্তানিকৃত পণ্য ভারতীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স রুহানী এন্টারপ্রাইজ, সোহানী এন্টারপ্রাইজ ও তাহানি এন্টারপ্রাইজ নামে বিভিন্ন ভুয়া লাইসেন্সে রপ্তানি করছিল।
ভারতীয়দের দেওয়া তথ্য মতে, এসব রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিক কুতুব মণ্ডল বা মণ্ডল গ্রুপ এবং পণ্য চালানটির ভারতে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কার্যাদি সম্পন্ন করেন অমিত শাহ বাপি।
জানা যায়, ভারতীয় কাগজপত্রে ১৬টি চালানকে মোটরসাইকেল পার্টস হিসেবে রপ্তানির ঘোষণা করা হলেও ট্রাকগুলোয় ছিল ওষুধ, জিলেট ব্লেড, ট্রিমার, শাড়ি, ফেব্রিক্স, ইমিটেশন জুয়েলারি, মূর্তি, হাতঘড়ি, চাদর, তালা, থ্রি-পিস, জুতা, সেলুন সামগ্রীসহ নানা পণ্য। জব্দ হওয়া এসব পণ্যের বৈধ কোনো নথিপত্র ভারতীয় কাস্টমের কাছে পাওয়া যায়নি।
ওপারের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মণ্ডল গ্রুপের ৫টি রপ্তানি লাইসেন্সের মধ্যে মাত্র একটি বৈধ ও বাকি চারটি ভুয়া বলে অভিযোগ। এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ রপ্তানি করে আসছে। ভারত থেকে মোটর পার্টস রপ্তানিতে প্রণোদনা (ইনসেপট্রি) পেয়ে থাকে রপ্তানিকারকরা। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এ ব্যবসা করে আসছে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা।
স্থানীয়দের তথ্য সূত্রে জানা যায়, বেনাপোল পোর্ট থানার পুটখালী ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা হাদিউজ্জামানের ভাই হাসানুজ্জামান। বেনাপোলের দুর্গাপুর গ্রামের আজিমসহ কতিপয় ব্যাবসায়ী রাজনৈতিক নেতা দুই দেশেই রাজস্ব ফাঁকি দিতে কৌশলে ভারত থেকে পণ্য আমদানি করে। তাদের সঙ্গে রাজস্ব ফাঁকিতে সিদ্ধহস্ত নামডাকী সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় ভারতীয় সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকের যোগসাজশ রয়েছে। অসাধু ব্যবসায়িক চক্র ও কতিপয় অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তা এবং বন্দর কর্মকর্তারা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি তাদের।
ভারতীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, বেনাপোল বন্দরের শেড ইনচার্জ ও আইআরএম টিম এবং শুল্ক গোয়েন্দার যোগসাজশে পূর্ব চুক্তি মোতাবেক শুল্ক ফাঁকি দিতে ভারত থেকে এমন পণ্য চালান আমদানি করেছিল। বাংলাদেশে এসব পণ্যের শুল্কায়ন গ্রুপ ও পরীক্ষণ গ্রুপ (আইআরএম) টিমের নামমাত্র পরীক্ষণে মোটা টাকার বিনিময়ে খালাস হয়ে যায় অবৈধ বড় বড় পণ্যের চালান।
বর্তমান কমিশনার খালেদ মোহাম্মদ আবু হোসেন বেনাপোল কাস্টম হাউজে যোগদান করার পর কাস্টমের দুর্নীতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছেন। কিন্তু আভ্যন্তরীণ পরিবর্তন না করায় আগের অবস্থানের স্ব স্ব জায়গায় কর্মকর্তারা বহাল থাকায় এক শ্রেণির নিম্ন কর্মকর্তারা অবৈধ পন্থাগুলো চালিয়ে যাচ্ছেন।
বেনাপোল বন্দরের একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, শুল্ক ফাঁকি দিতে দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। তারা অবৈধ পণ্য বৈধ কাগজপত্রের আড়ালে বাংলাদেশে আমদানি করে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন মহল জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
রপ্তানি পণ্য আটকের ঘটনায় জড়িত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে বেনাপোল কাস্টম হাউসের ইনভেজটিকেশন রিসার্স ম্যানেজমেন্ট (আইআরএম) উপকমিশনার রাফেজা সুলতানার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রবেশকালে ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে বড় একটি পণ্য চালান আটকের খবর পেয়েছি। তবে এই ঘটনাটি আমাদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। কাস্টমসের কর্মকর্তাদের সচেতন থাকতে বলা হয়েছে। যাতে এ ধরনের মালামাল অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে।