সুফল চাকমা, বান্দরবান
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৯:১৭ এএম
প্রবা ফটো
প্রকৃতিনির্ভর পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ের ঢালু ভূমিতে উৎপাদিত জুমের ধান কাটা শুরু হয়েছে। শরৎকালের এ মৌসুমে সবুজ পাহাড় এখন সোনালি রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। চোখ যতদূর যায়Ñ কোথাও সবুজ আবার কোথাও হলুদাভ সোনালি পাকা ধান দোল খাচ্ছে পাহাড়ি জুমক্ষেতে। চলতি বছর সময়মতো বৃষ্টি হওয়ার কারণে ধান তাড়াতাড়ি বপন করা সম্ভব হয়েছে, ফলে ফলনও ভালো হয়েছে, জুম চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে।
জুমের অনেক ক্ষেতেই ধান পাকতে শুরু করেছে। কেউ কেউ ধান কেটে নিচ্ছেন আবার অনেক চাষি অপেক্ষা করছেন আরও কয়েক দিনের জন্য। শিগগিরই বৃহৎ আকারে ধান কাটা শুরু হবে বলে আশা করছেন জুম চাষিরা।
ধান কাটার আগে জুম চাষিরা মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা, মারফা, চিনালসহ বিভিন্ন সাথী ফসল সংগ্রহ শুরু করেছেন। তিন পার্বত্য জেলাÑ বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির দুর্গম এলাকায় এখন জুম চাষিদের ব্যস্ত সময় কাটছে। জুম আবাদ ঘিরে চলছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।
বর্তমানে জেলা শহরের আশপাশে জুম আবাদ খুব একটা দেখা যায় না। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জমি সংকট ও বাগান চাষের কারণে জুম আবাদ সীমিত হয়ে এসেছে। এখন মূলত ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং সাথী ফসল উৎপাদনের জন্য ছোট আকারে জুমচাষ করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে রোয়াংছড়ি উপজেলার আলেক্ষ্যং ইউনিয়নের বটতলীপাড়ার বাসিন্দা জুম চাষি ভালো কুমার তঞ্চঙ্গ্যার জুমে সরেজমিনে দেখা যায় সপরিবারে এবং কয়েকজন নারী শ্রমিক নিয়ে পাকা ধান কাটতে এসেছেন। সাধারণত জুমের ধানগাছ মানুষের কোমর সমান হয়ে থাকে, কিন্তু এ বছর তার জুমের ধান বুক থেকে গলাসমান উঁচু হয়েছে।
তিনি জানান, এবার মাত্র দুই আড়ি জায়গায় জুম করেছি। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ার কারণে ধান ভালো হয়েছে। যখন বৃষ্টির দরকার ছিল তখন বৃষ্টি হয়েছে, আর রোদের সময় রোদ মিলেছে। গত বছর অনুকূল আবহাওয়া না থাকায় ফলন ভালো হয়নি, কিন্তু এ বছর আশানুরূপ ফলন পাব বলে মনে হচ্ছে।
অন্য এক জুম চাষি উৎসবলতা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, তঞ্চঙ্গ্যারা ‘মঙ্গোয়থ ধান আর মারমারা ‘মংটংথ ধান হিসেবে যেটি চাষ করেন, এ বছর তা ভালো ফলন দেবে। গত বছর তিনি ১ আড়ি ধান চাষ করে ৭৫ আড়ি ধান পেয়েছিলেন, এ বছর তার প্রত্যাশা ১৫০ আড়ি ধান পাবেন।

প্রতি বছর নভেম্বর-ডিসেম্বরে জুমের জমি নির্ধারণ করা হয়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে জঙ্গল কাটা হয় এবং মার্চ-এপ্রিলে তা শুকিয়ে পোড়ানো হয়। এপ্রিল-মে মাসে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি শুরু হলে ধানসহ ৩০-৩৫ ধরনের সাথী ফসল বপন করা হয়। বৈশাখ মাসের প্রথম বৃষ্টির পর যারা বপন করেন তাদের ফলন আগে আসে, দেরিতে বপনকারীদের ধান পরে কাটার উপযুক্ত হয়। আগস্টের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের শুরুতে ধান কাটা শুরু হয়। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর জুড়ে চলে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ। এরপর ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসব পালন করা হয়।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে আবাদ হয়েছিল ৮ হাজার ৫৪০ হেক্টরে, উৎপাদন ১০ হাজার ৪৮৯ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছর আবাদ হয়েছিল ৮ হাজার ২৬৭ হেক্টরে, উৎপাদন ১২ হাজার ৪৯৯ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছর (বর্তমান মৌসুম) আবাদ হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৩০০ হেক্টরে, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৩৬৬ মেট্রিক টন।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ এমএম শাহনেয়াজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘চলতি মৌসুমে জুমচাষে আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। এপ্রিল-মে মাসে সময়মতো বৃষ্টি পাওয়ায় এবং পরে যথাসময়ে রোদ থাকার কারণে ফলন ভালো হয়েছে। পাহাড়ে মাইক্রো ক্লাইমেট ভিন্নতার কারণে কোথাও আগে কোথাও পরে ধান পাকে। তবে এবারের জুম ফসল আশানুরূপ হবে বলে আমরা মনে করছি।’
তিনি আরও জানান, জুমে স্থানীয় বিভিন্ন জাতের ধান যেমনÑ বড় ধান, মংটং, গেলন ধান, কালো বিন্নি, লাল বিন্নি, সাদা বিন্নি, নাটং প্রু ধান আবাদ হয়। স্থানীয়রা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এ জাতের বীজ সংরক্ষণ করে আসছেন।