মোকছেদুল মমিন মোয়াজ্জেম, হিলি (দিনাজপুর)
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৫ ২০:৫৫ পিএম
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৫ ২১:০৯ পিএম
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার খিয়ারমামুদপুর গ্রামের সাদা শাপলার বিল এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে স্বপ্নের রাজ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিলজুড়ে যখন সাদা শাপলা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন প্রকৃতির এই অনন্য সৌন্দর্য উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন শত শত প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ।
বিলের জলে কাঠের নৌকা এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ে সারি সারি শাপলা। যত দূর চোখ যায়, কেবলই শাপলার রাজত্ব। দর্শনার্থীরা নৌকায় ভেসে বেড়াচ্ছেন, ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের ভাবিয়ে তুলছে।
বিলের মাঝখানে রয়েছে দ্বীপসদৃশ সমতলভূমি। সেখানে স্থানীয় জেলেরা বিশ্রাম ও মাছ সংরক্ষণের জন্য বাঁশ ও টিনের ছাউনি দিয়ে টং তৈরি করেছেন। শাপলা দেখতে যাওয়া মানুষজন সেই টংয়ে বসে আড্ডা দেয়, গান করে। স্থানীয় শিল্পীদের কণ্ঠে গান ধ্বনিত হলে বিলের পরিবেশ যেন আরও মোহনীয় হয়ে ওঠে।
শুধু শাপলাই নয়, বিলে জন্মেছে শালুকও। স্থানীয়দের অনেকেই শালুক তুলে নিয়ে যায়। পাশাপাশি রয়েছে কই, মাগুর, টাকি, পুঁটিসহ নানা প্রজাতির দেশি মাছ। প্রতিদিন ভোরে জেলেরা এসব মাছ ধরে বিলপাড়েই বিক্রি করেন। অনেক দর্শনার্থী শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি পছন্দসই মাছ কিনে বাড়ি ফেরেন।
স্থানীয়দের মতে, প্রায় ৬০০ বিঘা আয়তনের এই বিলের পশ্চিমাংশের নাম আমরুল বিল আর পূর্বাংশের নাম কাললা বিল। বর্ষার পানি নেমে গেলে কৃষকরা এখানে আমন ধান চাষ করেন। ধান কাটার পর পশ্চিম পাশে জন্মে এক ধরনের আগাছা আমরুল। আর পূর্ব পাশে জন্মে কাললা বা হলদে মুথা নামের আগাছা। সেই থেকেই দুটি অংশের আলাদা নামকরণ।
বিলে শাপলা দেখতে আসা পর্যটকদের ঘোরানোর জন্য স্থানীয়রা নৌকা চালান। বর্ষার সময়ে এটি তাদের জন্য বাড়তি আয়ের পথ খুলে দেয়। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. মুরাদ (১০) জানায়, প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত আর বিকালে স্কুল শেষে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি নৌকা চালাই। দর্শনার্থীরা দুই চারজন করে নৌকায় ওঠেন। ট্রিপ ভেদে ১০০ থেকে ২০০ টাকা ভাড়া পাই। কেউ অনেকক্ষণ ঘুরতে চাইলে ৩০০ টাকাও দেয়। সকালে আমি স্কুলে যাই, তারপর বিকালে আবার নৌকা চালাই। এতে পড়াশোনার ক্ষতি হয় না, আবার সংসারেও কিছু সাহায্য করতে পারি।
নওগাঁ থেকে শাপলা দেখতে আসা লুৎফর রহমান বলেন, বিলের দক্ষিণ পাশে ভারত সীমান্ত। মাঝখানে ছোট্ট জঙ্গল আছেÑ যা দূর থেকে দ্বীপের মতো মনে হয়। চারপাশে অসংখ্য শাপলা আর শালুক। এমন দৃশ্য সত্যিই মুগ্ধ করে। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে এসেছি, ভেবেছিলাম ছোটখাটো বিল হবে। কিন্তু এখানে এসে যেন অন্য এক জগতে চলে এলাম। এত সুন্দর দৃশ্য আমি আগে কোথাও দেখিনি।
স্থানীয় বাহার আলী বলেন, আমাদের এলাকার অনেক মানুষ সিলেট, কক্সবাজার বা টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে যায়। অথচ আমাদের নিজস্ব গ্রামেই এমন অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আছে, তা আমরা বুঝতেই পারিনি। এখানে এলে মনে হয় প্রকৃতি আমাদের জন্য সাদা ফুলের কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছে। আমি চাই, প্রশাসন যেন এই বিলকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে। তাহলে দেশ বিদেশের মানুষ আসবে, স্থানীয় অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে।
বিরামপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা আক্তার বলেন, খিয়ারমামুদপুর গ্রামের শাপলার বিল সম্পর্কে আমি অনেক কিছুই শুনেছি। অচিরেই সরেজমিন পরিদর্শন করব। দর্শনার্থীরা যাতে প্রকৃতির ক্ষতি না করে, সেদিকে সবার সচেতন হওয়া জরুরি। প্রয়োজনে আমরা জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালাব। প্রকৃতিকে রক্ষা করেই পর্যটন গড়ে তুলতে হবে। বর্ষার মাঝামাঝি থেকে শাপলার মৌসুমে প্রতিদিন ভিড় জমে খিয়ারমামুদপুরের বিলে। কেউ পরিবার নিয়ে আসেন, কেউ বন্ধুদের নিয়ে, আবার কেউ একা প্রকৃতির সান্নিধ্যে ডুব দিতে আসেন। নৌকা ভ্রমণ, ছবি তোলা, মাছ কেনা আর বিলপাড়ে আড্ডা সব মিলিয়ে এটি এখন বিরামপুরের অন্যতম প্রাণবন্ত জায়গা।