অরুপ রতন, বগুড়া
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৫১ এএম
প্রবা ফটো
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার হাটখোলায় গড়ে উঠেছে দুর্লভ প্রজাতির শামুকখোল পাখির নিরাপদ অভয়ারণ্য। গাছের ডালে ডালে শত শত বাসা বেঁধে এখন হাজারো শামুকখোলের কলতানে মুখর হয়ে উঠেছে এলাকা। প্রতিদিনই পাখিপ্রেমী ও কৌতূহলী মানুষ ভিড় করছে এই বিরল দৃশ্য দেখতে।
একসময় কেবল কয়েক জোড়া পাখি এ এলাকায় আসত। বাড়তে বাড়তে এখন তা কয়েক হাজারে দাঁড়িয়েছে। বাঁশঝাড়, শিমুল, কদম, পাকুড়, মেহগনি ও পিটাহরিসহ বিভিন্ন গাছে বাসা বেঁধেছে তারা। একেকটি গাছে ২৫-৩০টি পর্যন্ত বাসা দেখা যায়। স্ত্রী-পুরুষ মিলে শুকনো ডাল ও লতাপাতা দিয়ে ১০-১২ দিনে বাসা তৈরি করে। জুলাই-আগস্ট মাসে তারা ডিম পাড়ে। সাধারণত ২-৫টি ডিম দেয় এবং প্রতি বাসায় অন্তত দুটি ছানা থাকে। প্রায় ২৫ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। ৩০-৩৫ দিনের মাথায় ছানারা উড়তে শেখে।
ধূসর রঙের পালক, বড় ডানা, লম্বা ঠোঁট ও কালো লেজের কারণে শামুকখোল সহজেই চেনা যায়। এদের প্রিয় খাবার শামুক হলেও মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙ ও ছোট জলজ প্রাণীও খায়। প্রতিদিন ভোরে তারা আশপাশের বিল ও ঝিলে খাবারের সন্ধানে যায় এবং সন্ধ্যায় ফিরে আসে।
বিহার গ্রামে পাখি, প্রাণী, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করছে সরকারি আজিজুল হক কলেজ ক্যাম্পাসভিত্তিক সংগঠন ‘তীর’ (টিম ফর এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ)। এক যুগ আগে সংগঠনটি বিহার গ্রামকে ‘নিরাপদ পাখির রাজ্য’ ঘোষণা করে। এতে গ্রামবাসীর মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়, পাখি ও প্রাণীর প্রতি জন্ম নেয় বিশেষ মমতা।
২০১২ সাল থেকে ‘তীর’ নিয়মিতভাবে কাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে উপজেলা প্রশাসন বিহার হাটখোলাকে ‘শামুকখোল পাখির রাজ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে মাসুদ রানার নেতৃত্বে তীরের আঞ্চলিক কমিটির ৪০-৫০ জন যুবক এই সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত।
-68b3c6cb6ccff.jpg)
২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, বিহার হাটখোলায় বাচ্চাসহ তিন হাজারের বেশি শামুকখোলের দেখা মেলে। আগে এখানে ১৬-১৭টি বড় গাছ ছিল, এখন কিছুটা কমে গেছে। এর মধ্যে কিছু গাছ ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও মালিকরা সহযোগিতা করছেন। স্থানীয়রা পাখি শিকার করেন না, বরং সংগঠনকে খবর দিয়ে সাহায্য করেন।
প্রতিদিনই বিহার হাটে পাখির কলতান উপভোগ করতে আসছে আশপাশের মানুষ। কেউ ছবি তুলছেন, কেউবা ভিডিও ধারণ করছেন। পরিবেশবিদদের মতে, উত্তরাঞ্চলে বর্ষাকালে শামুকখোল বেশি দেখা গেলেও খাবার পর্যাপ্ত থাকায় বিহার হাটখোলা এখন তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
হাটে দোকান নিয়ে বসা আবু তালহা বলেন, ‘প্রতি বছরই চৈত্র মাসে আসে, কার্তিকের দিকে চলে যায়। প্রায় ১০-১২ বছর ধরে নিয়মিত আসছে। এখানে কেউ কোনো ক্ষতি করে না, বরং সবাই দেখাশোনা করে। তাই এলাকা এখন ওদের জন্য নিরাপদ স্থান হয়ে গেছে।’
তীরের সাবেক সভাপতি হোসেন আলী বলেন, ‘শামুকখোল মূলত দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসে। খাবারের সংকট হলে তারা উত্তরাঞ্চলে চলে আসে এবং এখানে ৪-৫ মাস থাকে। জুলাই থেকে আগস্ট হলো এদের প্রজনন মৌসুম। এরপর বাচ্চা বড় করে কার্তিক মাসের দিকে চলে যায়।’
তীরের আঞ্চলিক কমিটির উপদেষ্টা শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমরা এখানে শামুকখোল পাখিদের আগলে রেখেছি। প্রথমে কাজটি সহজ ছিল না। পরে বিভিন্ন উঠান বৈঠক, সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর কারণে এখন সবাই পাখিদের বাসস্থান নিরাপদ স্থানে পরিণত করেছে।
বগুড়া শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, পাখিগুলোর বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ প্রতিনিয়ত খোঁজখবর নেওয়া হয়। পাখিরগুলো যেন নিরাপদ থাকে, সে বিষয়ে আমরা লক্ষ রেখেছি।