মধ্যাঞ্চলীয় অফিস
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৫ ২২:০১ পিএম
কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবক্সে মিলল এমন এক চিঠি। যেখানে লিখা রয়েছে, ‘হে পাগলা বাবা তোমার দোয়ার বরকতে নির্বাচন চাই না, আমাদের দরকার ইউনূস সরকার, তুমি দোয়া কারো- যেন নির্বাচন না হয়, দোয়া রহিল, ইতি সাধারণ জনগণ।’
এবার ১৪টি দানবাক্সে পাওয়া গেছে ১২ কোটি ৯ লাখ ৩৭ হাজার ২২০ টাকা। এ ছাড়া মিলেছে বিপুল স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রা। শনিবার (৩০ আগস্ট) দিনভর গণনা শেষে রাত সাড়ে ৮ টার দিকে বিষয়টি জানান দানবাক্স খোলা কমিটির আহ্বায়ক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এরশাদুল আহমেদ। এর আগে সকালে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফৌজিয়া খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজাবে রহমত ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী, জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক মো. রমজান আলীর উপস্থিতিতে মসজিদের ১৪টি লোহার দানবাক্স খোলা হয়। এসময় সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
দানবাক্সে পাওয়া যায় ৩২ বস্তা টাকা। পরে মসজিদ কমপ্লেক্সের দুই তলায় নিয়ে টাকা গণনার কাজ শুরু হয়। এসব বস্তাভর্তি টাকা গণনার কাজে অংশ নেয় পাগলা মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য, মসজিদ কমপ্লেক্সে অবস্থিত মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পার্শ্ববর্তী জামিয়া এমদাদিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী, রূপালী ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মাচারীসহ চার শতাধিক মানুষ।
এর আগে গত ১২ এপ্রিল পাগলা মসজিদের ১১ টি দানবাক্স থেকে ৯ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৬৮৭ টাকা পাওয়া যায়। মসজিদটিতে নিয়মিত হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র দান করেন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অসংখ্য মানুষ।
তবে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় দানবাক্সে জমা পড়া শত শত চিরকুট, এসব চিঠিতে লোকজন তাদের জীবনে পাওয়ার আনন্দ, না পাওয়ার বেদনা, আয়-উন্নতির ফরিয়াদ, চাকরির প্রত্যাশাসহ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ উন্নতি কামনা করেন। তবে এবারের কিছু চিরকুটে উঠে এসেছে রাজনৈতিক বার্তা। দেখা গেছে, কেউ লিখেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে, আবার কেউ মত প্রকাশ করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে। এক চিঠির মধ্যে রয়েছে, ‘হাসিনার শাস্তি না দেখা পর্যন্ত আমাকে বাঁচিয়ে রেখ আল্লাহ’, আরেকটি মধ্যে রয়েছে, ‘শেখ হাসিনা আসবে বাংলাদেশ হাসবে’।
জনশ্রুতি আছে, এক সময় এক আধ্যাত্মিক পাগল সাধকের বাস ছিল কিশোরগঞ্জের হারুয়া ও রাখুয়াইল এলাকার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত নরসুন্দা নদের মধ্যবর্তী স্থানে জেগে ওঠা উঁচু স্থানটিতে। মুসলিম-হিন্দু নির্বিশেষে সব ধর্মের লোকজনের যাতায়াত ছিল ওই সাধকের আস্তানায়। তার মৃত্যুর পর উপাসনালয়টিকে পাগল পীরের মসজিদ হিসেবে ব্যবহার শুরু করে এলাকাবাসী। কিন্তু ওই সাধকের মুত্যুর পর থেকে আশ্চর্যজনকভাবে দূর-দূরান্তের লোকজনের ভিড় বাড়তে থাকে। মান্নত কিংবা দান খয়রাত করলে মনোবাসনা পূরণ হয়—এমন বিশ্বাস থেকে বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ মান্নত নিয়ে আসেন এ মসজিদে। তারা টাকা-পয়সা, স্বর্ণ ও রুপার অলঙ্কারের পাশাপাশি গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি—এমনকি বৈদেশিক মুদ্রাও দান করেন। বিশেষ করে প্রতি শুক্রবার বিভিন্ন স্থান থেকে এ মসজিদে মান্নত নিয়ে আসা বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষের ঢল নামে। আগতদের মধ্যে মুসলিমদের অধিকাংশই জুমার নামাজ আদায় করেন মসজিদে। আর এ ইতিহাস প্রায় আড়াইশ বছরেরও অধিক সময়ের বলে জানা যায়।
বর্তমানে কিশোরগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে পাগলা মসজিদ অন্যতম। শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে মাত্র ১০ শতাংশ জমির ওপর মসজিদটি গড়ে উঠলেও বর্তমানে কমপ্লেক্সটিতে রয়েছে ৩ একর ৮৮ শতাংশ জায়গা। ইতোমধ্যে দেশের অন্যতম আয়কারী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত মসজিদটিকে‘ পাগলা মসজিদ ইসলামি কমপ্লেক্স’ নামকরণ করা হয়েছে। মসজিদের দানবাক্স থেকে পাওয়া অর্থ সংশ্লিষ্ট মসজিদসহ জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানার পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হয়। এছাড়া করোনাকালে রোগীদের সেবায় নিয়োজিত শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবককেও অনুদান দেওয়া হয়েছিল এ দানের টাকা থেকে।
পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানিয়েছে, ঐতিহ্যবাহী পাগলা মসজিদে আন্তর্জাতিক মানের দৃষ্টিনন্দন ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগিগির এর কাজ শুরু হবে। যার নামকরণ হবে পাগলা মসজিদ ইসলামিক কমপ্লেক্স। এটি নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৫ কোটি টাকা। সেখানে ৩০ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন।