মোকছেদুল মমিন মোয়াজ্জেম, হিলি
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৫ ১৬:২৩ পিএম
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার জোতমাধব গ্রামের শালবনে বেড়ে উঠেছে গিলা লতাগাছ দেখতে দর্শ।নার্থীদের ভিড় বাড়ছে প্রতিদিন।প্রবা ফটো
প্রকৃতির অপরূপ খেয়াল। মাটি থেকে চারটি লতা পেঁচিয়ে উঠেছে শালগাছের মাথা ছুঁয়ে। দূর থেকে মনে হবে, আকাশে ওঠার মতো সবুজ সিঁড়ি তৈরি হয়েছে। শালবনের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে অদ্ভুত এ দৃশ্য। কেউ লতায় বসে ছবি তুলছেন, কেউবা ঝুলন্ত ফলের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে হতবাক।
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার ৬ নম্বর জোতবানী ইউনিয়নের জোতমাধব গ্রামের শালবনে বেড়ে উঠেছে এই গিলা লতাগাছ। প্রায় ১০ হাত উত্তর-দক্ষিণে ও ১৫ হাত পূর্ব-পশ্চিমজুড়ে ছড়িয়েছে চারটি লতার বিস্তার। কোনো কোনো লতাগাছ থেকে মাটিতে নেমে আবার শিকড় হয়ে জন্ম নিয়েছে। লতায় ঝুলছে বৃহৎ আকারের সবুজ ফল। দেখতে অনেকটা লাউয়ের মতো হলেও আকারে বেশ বড়।
গিলা লতাগাছ শিম পরিবারের লতাজাতীয় সবুজ উদ্ভিদ। একেকটি গাছ ১৪০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর পাতা যৌগিক, প্রতিটি পত্রফলকে থাকে দুই থেকে আটটি ছোট পত্রক। মে মাসে ফোটে সাদা পাপড়ির সরু ফুল আর অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মধ্যে পাকে ফল। প্রতিটি ফলে থাকে ১০-১৫টি শক্ত ও চ্যাপ্টা লালচে বীজ। গলিয়ার কাণ্ড, পাতা, ছাল ও বীজে রয়েছে নানা ঔষধি গুণ। তবে এদেশের বনাঞ্চল থেকে এই গাছ এখন প্রায় বিলুপ্ত।
শালবনে এই চারটি গিলা গাছ রোপণ করেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা জালাল উদ্দীন। পেশায় তিনি নলকূপ মিস্ত্রি। তিনি জানান, প্রায় আট বছর আগে লালমনিরহাট থেকে কয়েকটি গিলা বীজ সংগ্রহ করেন। রান্নার জন্য বীজ আনা হলেও তার স্ত্রী তাহমিনা খাতুন চারটি বীজ বেছে বাড়ির আঙিনায় রোপণ করেন। আস্তে আস্তে চারাগুলো বড় হতে থাকে। কয়েক বছর পর শালবনের ভেতরে স্থানান্তর করা হয় চারা।
জালাল উদ্দীন বলেন, এখন প্রতি বছর গাছে প্রচুর ফুল ও ফল ধরে। গড়ে ১০০ থেকে ১৫০টি বীজ পাওয়া যায়। চারটি গাছের মধ্যে একটি স্ত্রী আর তিনটি পুরুষ গাছ। স্ত্রী গাছেই ফল ধরে।
প্রতিদিন শালবনে ভিড় করেন কৌতূহলী মানুষ। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখছে অদ্ভুত লতার বিস্তার। অনেকেই লতায় বসে ছবি তোলেন, শিশু-কিশোররা খেলায় মেতে ওঠে।
স্থানীয়দের মতে, সামাজিক মাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে পড়ায় আশপাশের উপজেলা থেকেও অনেক মানুষ গলিয়া দেখতে আসছেন। দর্শনার্থী সোহেলী আক্তার বলেন, ‘এমন লতা আমি আগে কখনও দেখিনি। মনে হয় যেন আকাশে ওঠার সবুজ সিঁড়ি।
জোতবানী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সাজেদুর রহমান বলেন, গিলা গাছটি গ্রামের শালবনের ভেতরে হওয়ায় সেখানে যাতায়াত কষ্টকর ছিল। রাস্তাটি সংস্কার করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের সুবিধা ও গাছ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দ্রুত নেওয়া হবে।
প্রকৃতিবিদদের মতে, গিলা লতাগাছ শিম পরিবারের সবচেয়ে বড় ফল উৎপাদনকারী উদ্ভিদ। মূলত পাহাড়ি অঞ্চল ও শালবনে জন্মালেও এটি এখন বিরল হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জনসচেতনতা ও সরকারি উদ্যোগে গবেষণার মাধ্যমে এ গাছের অস্তিত্ব রক্ষা সম্ভব।
দিনাজপুরের এই শালবনে গিলা লতার বিস্তার যেন প্রকৃতির শিল্পকর্ম। একদিকে গ্রামের মানুষের গর্ব, অন্যদিকে পর্যটকদের কাছে বিস্ময়ের এক আকর্ষণ। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এ গাছ শুধু স্থানীয় পর্যটন নয়, গবেষণার ক্ষেত্রেও মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।