হিমাগারের আলু
নিয়ন দুলাল, লালমনিরহাট
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৫ ১৪:১৫ পিএম
চলতি মৌসুমে বাজারে দাম না থাকায় লালমনিরহাটের কৃষকরা হিমাগার থেকে আলু তুলতে না আসায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অনেক আলু। প্রবা ফটো
সরকার কেজিপ্রতি আলু ২০-২২ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে সেই দাম নেই। ফলে লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা হিমাগারে সংরক্ষিত আলু নিয়ে পড়েছেন চরম সংকটে। হিমাগারে রাখা ৬০ কেজির এক বস্তা আলুর উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচ যেখানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা, সেখানে বর্তমান বাজারে প্রতি বস্তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭০০-৮০০ টাকায়। এতে প্রতি বস্তায় গড়ে ৬০০ টাকার বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষকরা বলছেন, বাজারে দাম না থাকায় তারা আলু বিক্রি করছেন না। এতে হিমাগারে মজুদ কমছে না। গত বছর এই সময়ে হিমাগার থেকে যেখানে প্রায় ৪০ শতাংশ আলু বিক্রি হয়েছিল, এবার তা ২০ শতাংশেরও নিচে। এতে লোকসানের পাশাপাশি নতুন করে দুশ্চিন্তায় হিমাগার মালিকরাও।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলার নয়টি হিমাগারে বর্তমানে ৭৮ হাজার মেট্রিক টন আলু সংরক্ষিত রয়েছে। চলতি মৌসুমে জেলার ৭,৮০০ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদন বেশি হওয়ায় মৌসুমের শুরু থেকেই কৃষকরা আশানুরূপ দাম পাচ্ছেন না।
হিসাব অনুযায়ী, হিমাগারে আলু মজুদের সময় এক বস্তার খরচ হয়েছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা। এর সঙ্গে ভাড়া যোগ করে মোট খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু চার মাস সংরক্ষণের পর এখন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় একই বস্তা আলু বিক্রি হচ্ছে। হিমাগার ভাড়া বাদ দিলে কৃষকের হাতে থাকছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা মাত্র।
আদিতমারীর চরিতাবাড়ী গ্রামের কৃষক সোহাগ বলেন, হিমাগারে ১০০ বস্তা আলু রেখেছিলাম। এখন পর্যন্ত বিক্রি করে হাতে এসেছে মাত্র ২৮ হাজার টাকা। অথচ মৌসুমে বিক্রি করলে পেতাম প্রায় ৬০ হাজার টাকা।
একই উপজেলার কমলাবাড়ীর কৃষক ফারুক হোসেন বলেন, ৫০ বস্তা আলু রেখেছি স্থানীয় ফাতেমা হিমাগারে। কিন্তু দাম না থাকায় বিক্রি করতে পারছি না। এখন বিক্রি করলে ২০ হাজার টাকার মতো লোকসান হবে। অথচ আমন ধান রোপণের খরচ জোগাতে এই আলু রেখেছিলাম।
কালীগঞ্জের চাঁপারহাট বাজারের ব্যবসায়ী মাসুদুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, আলুর দাম বাড়লে সরকার কমাতে ব্যবস্থা নেয়। এখন দাম পড়ে গেলেও কেউ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়েই সর্বনাশে পড়েছেন।
আরেক ব্যবসায়ী জাবেদ হোসেন জানান, তিনি ১৫০ টাকা বস্তা দরে কয়েক ট্রাক আলু কিনলেও পাইকারি বাজারে চাহিদা না থাকায় তা পাঠাতে পারছেন না। হিমাগার মালিকদের দাবি, কৃষক ও ব্যবসায়ী কেউ আলু তুলতে আসছেন না। গত বছর আগস্ট মাসেই ৫০ থেকে ৬০ হাজার বস্তা আলু হিমাগার থেকে সরানো হয়েছিল। এবার তা মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার বস্তায় এসে ঠেকেছে।
লালমনিরহাট জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. হারুনুর রশিদ বলেন, কৃষকরা আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাইখুল আরেফিন বলেন, চলতি মৌসুমে কিন্তু বাজারে দাম না থাকায় কৃষকরা আলু তুলতে আসছেন না। এতে আলুর বাজার ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাইখুল আরেফিন বলেন, চলতি মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৭৮ হাজার মেট্রিক টন আলু হিমাগারে সংরক্ষিত আছে। কৃষকরা আলু তুলতে না আসায় বাজার ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।