হাসিব আল আমিন, নোয়াখালী
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৫ ১৪:১০ পিএম
গত বছরের ভয়াবহ বন্যা দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে আবারও স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে নোয়াখালী সদরের এওজবালিয়া, কালাদরপ ও আন্ডারচর ইউনিয়নের বাসিন্দারা। প্রবা ফটো
গত বছরের ভয়াবহ বন্যা দুঃস্বপ্ন বয়ে এনেছিল নোয়াখালীবাসীর জীবনে। ভারতের উজানের পানি ও টানা বর্ষণে তলিয়ে গিয়েছিল গ্রামের পর গ্রাম। ভেসে গিয়েছিল ঘরবাড়ি, নষ্ট হয়েছিল জমির ধান-সবজি, থেমে গিয়েছিল জীবিকার চাকা। অনেক পরিবারকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল আশ্রয়কেন্দ্রে।
সেই কঠিন সময় পেরিয়ে এখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। পানি নেমে যাওয়ার পর বাড়িঘর মেরামত, নতুন করে ফসল ফলানো এবং জীবিকা উপার্জনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তারা। কৃষকরা ফের জমিতে ধান ও সবজি লাগাচ্ছেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দোকান মেরামত করে ব্যবসা শুরু করেছেন।
নোয়াখালী সদরের এওজবালিয়া, কালাদরপ ও আন্ডারচর ইউনিয়নে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী আলী হোসেন, পান্না বেগম, ঝর্ণা আক্তারসহ অনেকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি তারা সঞ্চয়ের চেষ্টাও করছেন। তবে ভোগান্তি পুরোপুরি শেষ হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানা গেছে, অস্ট্রেলিয়ান হিউম্যানিটেরিয়ান পার্টনারশিপের (এএইচপি) অর্থায়নে এবং অক্সফামের সহযোগিতায় কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কোডেক) বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৬১৭টি পরিবারকে বহুমুখী মানবিক সহায়তা দিয়েছে।
এর মধ্যে ৭৫০ পরিবারকে নগদ সহায়তা, খাদ্য ও স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। ক্যাশ-ফর-ওয়ার্ক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তারা ৪৩টি সড়ক মেরামত করেছে এবং প্রত্যেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা মজুরি পেয়েছে। জীবিকা পুনরুদ্ধারে আরও ৭৫০ পরিবারকে ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরুর জন্য ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া টিউবওয়েল, ল্যাট্রিন ও নারীদের জন্য গোসলখানা নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রতিবন্ধী আলী হোসেন হারিয়েছিলেন তার ছোট দোকানঘর। আশ্রয়কেন্দ্রে কয়েক সপ্তাহ কাটানোর পর তিনি ফের দোকান চালু করেছে। তিনি বলেন, বন্যা সবকিছু নিয়ে গিয়েছিল। আমি কোনো কাজ করতে পারি না, শুধু বসে বসে দোকান চালাতে পারি। কোডেকের সহায়তায় দোকান শুরু করেছি। পরিবারের খরচ মিটিয়ে প্রতিদিন কিছু টাকা জমাচ্ছি।
ঝর্ণা আক্তারও বন্যায় সব হারিয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখন একটি সেলাই মেশিন পেয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। তার ভাষায়, প্রায় ২০ দিন আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলাম। ঘরে ফিরে দেখি সব শেষ। একটা সেলাই মেশিন আমার ভাগ্য বদলে দিয়েছে। পরিবারের খরচ চালানোর পাশাপাশি সঞ্চয়ও করছি।
কালাদরপের গৃহবধূ রহিমা বেগম বন্যায় জমির সব ফসল হারান। পরে নতুন করে শীতকালীন সবজি লাগিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আছেন। তিনি বলেন, সবজি বিক্রি করে পরিবার চালাচ্ছি। আবার অন্যদেরও দিতে পারছি। কৃষিকাজ আমাকে স্বাবলম্বী করেছে। এ ছাড়া হোগলাপাতাগুলো বন্যায় নষ্ট হয়ে গেছিল। আমি নতুন করে পাতা ক্রয় করে রশি বানিয়ে বাড়তি আয় করতে পারছি।
শুধু তারা নন, ঝর্ণা, রহিমা ও পান্নাদের মতো অসংখ্য পরিবার এখন নতুন স্বপ্ন দেখছেন। চোখে এখনও বেদনার ছাপ থাকলেও মনে জেগেছে দৃঢ় প্রত্যয়।
প্রকল্পের মনিটরিং অফিসার শর্মী আক্তার জানান, যাচাই-বাছাই করে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়েছে। এর ফলে অসংখ্য অসহায় পরিবার জীবিকা ফিরে পেয়েছে। বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ায় পরিবারগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া নয়টি স্কুলে ৭৫০ জন ছাত্রছাত্রীকে হাত ধোয়ার কৌশল ও মেয়েদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে জেন্ডার, শিশু সুরক্ষা ও নারী অধিকার নিয়ে সচেতনতামূলক সেশন হয়েছে।
পাশাপাশি ১৮০ যুব সদস্যকে নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক ও রিপোর্টিং গ্রুপ গঠন করে কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
নোয়াখালীর সদরের ইউএনও হোমায়রা ইসলাম বলেন, নোয়াখালীর মানুষ বহুদিন ধরে বড় ধরনের বন্যা দেখেনি। তাই এবারের ক্ষয়ক্ষতি ছিল অপ্রত্যাশিত। তবে সরকারি সহায়তা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে অনেকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছেন। আশা করি কোডেকের মতো সংস্থাগুলো আরও কাজ করবে এবং বাকি ক্ষতিগ্রস্তরাও উপকৃত হবেন।