মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৫ ১০:২০ এএম
খুলনার তেরখাদা উপজেলার শেখপুরা হাটে নৌকা বেচাকেনার ব্যস্ততা। প্রবা ফটো
বর্ষা না এলে ঘরেই বসে থাকি। পানি এলে নৌকা লাগে। আর নৌকা কিনতে এলেই শেখপুরা হাটের নাম মনে পড়ে। বলছিলেন রামপ্রসাদ বালা, যিনি কিনেছেন একটি কাঠের নৌকা, মাছ ধরার জন্য।
বর্ষা এলেই খুলনার তেরখাদা উপজেলার শেখপুরা গ্রাম যেন ফিরে পায় চিরচেনা ব্যস্ততা। শুক্রবার সকালে পা রেখেই বোঝা যায়Ñ এই হাট শুধুই হাট নয়, এটি নদীনির্ভর জনপদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি আর টিকে থাকার সংগ্রামের এক জীবন্ত নিদর্শন। শতবর্ষী এই বাজারটি পরিচিত ‘নৌকার হাট’ নামে, যার পরিচিতি আজ শুধু তেরখাদা নয়, ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। আঠারোবেকি নদীর তীরে গড়ে ওঠা হাটটি একসময় ছিল সম্পূর্ণ জলপথনির্ভর। এখন বদলেছে অনেক কিছু, যোগ হয়েছে সড়কপথ, এসেছে আধুনিকতা, তবু বদলায়নি নৌকার কদর। বরং বর্ষাকালে এর চাহিদা ও ব্যস্ততা যেন বেড়েই চলেছে। নৌকার হাট নামে খ্যাত এই বাজার যেন বাঁচিয়ে রেখেছে দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ মানুষের বর্ষানির্ভর জীবনযাত্রার আবহমান ঐতিহ্য।
তেরখাদা উপজেলা সদর থেকেও বেশি কদর এখন শেখপুরা হাটের। এখানকার নৌকা সরবরাহ হয় খুলনা, গোপালগঞ্জ, নড়াইল ও বাগেরহাটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে চলাচল, কৃষিকাজ ও মাছ ধরার কাজে নৌকার বিকল্প নেই এসব এলাকায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষক ওমর আলী বিশ্বাস বলেন, বিলে ফসল তুলতে গেলে এই নৌকা ছাড়া উপায় নাই। এবার ৩ হাজার ২০০ টাকায় একটা কিনলাম। আগেরটা পুরান হইয়া গেছিল। নৌকার মূল উৎস বাগেরহাটের চিতলমারী। একসময় সেখানকার কোদালিয়া বিল থেকে পানিপথেই নৌকা ভাসিয়ে আনা হতো শেখপুরা। বেপারীরা নদীপথে মোল্লাহাট হয়ে কেন্দুয়া, শিয়ালী আর আঠারোবেকি নদী পেরিয়ে পৌঁছাতেন হাটে। তবে কালের বিবর্তনে বিল, খাল ও নদী হারিয়ে যাওয়ায় এখন সড়কপথই ভরসা। টমটম বা নছিমনে (স্থানীয় যন্ত্রচালিত বাহন) একটির ওপর একটি সাজিয়ে নিয়ে আসা হয় নৌকা।
অলিয়ার শেখ একজন দীর্ঘদিনের নৌকা ব্যবসায়ী জানান, এই হাটে শুক্রবার ২৮টা নৌকা নিয়ে আসছিলাম। ১১টা বিক্রি হইছে দুপুর নাগাদ। প্রতিটিতে ৩০০-৫০০ টাকা লাভ থাকে। অবিক্রীত থাকলে আবার ফেরত নিতে হয়।
শেখপুরার নৌকার হাট ঘিরে তৈরি হয়েছে একটি জটিল অথচ সংগঠিত মৌসুমি অর্থনীতি। সংশ্লিষ্টরা জানালেন, একটি নৌকার পেছনে রয়েছে অন্তত আট ধরনের পেশাজীবীর সম্পৃক্ততা। গাছ কাটার লোক, কাঠ সরবরাহকারী, স’মিল শ্রমিক, কাঠশিল্প কারিগর, পরিবহনকর্মী, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা, হাট ইজারাদার, আর সর্বশেষ ব্যবহারকারীÑ যারা এই নৌকাতেই চলেন, পাড়ি দেন জীবন।
এ ছাড়া হাটে ভিড় জমে যাওয়া মানুষদের ঘিরে খাবারের দোকান, চায়ের টং, যন্ত্রাংশ বিক্রেতা, কাঁচামালের বিক্রেতারাও উপকৃত হন। শেখপুরা হাটের ইজারাদার মো. এস্কেন্দার মোল্লা বলেন, প্রতি হাটে প্রায় ৬০-৭০টি নৌকা বিক্রি হয়। প্রতিটির খাজনা ৩০০-৪০০ টাকা, তবে দরিদ্রদের জন্য ছাড়ও দিই।
শেখপুরা হাটে নৌকা কেনাবেচা চলে জুনের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই তিন মাস। এই মৌসুমেই বাজারে আসে প্রায় ৪০ কোটি টাকার নৌকা।
তবে আশঙ্কার কথাÑ নদী ও বিল হারিয়ে যাওয়ার কারণে ভবিষ্যতে এই হাটের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
যেখানে প্রযুক্তি, সেতু আর রাস্তাঘাট এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে এখনও নৌকায় ভরসা কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রবীণ শিক্ষক শ্যামল দাশ বললেন, আমরা নদীর সন্তান। এখানে বর্ষা মানেই চারপাশে পানি। স্কুলে যেতাম নৌকায়, এখনও বাজারে যাই নৌকায়। এই হাট আমাদের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রেখেছে।
নৌকার হাট আজও টিকে আছে তার ঐতিহ্য আর প্রয়োজনীয়তার কারণে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, নদী ভরাট ও খাল-নালা হারানোর কারণে এই বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে এই হাট, এর কারিগর, এর মৌসুমি অর্থনীতি যদি পৃষ্ঠপোষকতা না পায়, তাহলে শতবর্ষী এই ঐতিহ্য হয়তো হারিয়ে যাবে ইতিহাসের পাতায়।