রংপুর
মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৫ ১৩:৪৫ পিএম
দুই দশক আগে বিভাগ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের ছোঁয়া পায়নি রংপুর। পায়রা গোলচত্বর এলাকা। প্রবা ফটো
দুই দশক আগে বিভাগ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের ছোঁয়া পায়নি রংপুর। সরকার পরিবর্তন হয়েছে একাধিকবার, এসেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও। প্রতিটি সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি অধিকাংশ প্রকল্প। এতে করে রংপুরবাসীর মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। প্রতিটি নির্বাচনের আগে রাজনীতিবিদরা সেতু, সড়ক, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থানসহ নানা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও সেগুলোর বেশিরভাগই থেকে গেছে শুধু ঘোষণার মধ্যে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। একাধিক প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও সেগুলো বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে।
জানা যায়, অবকাঠামো, যোগাযোগ, শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ নানা দাবিতে আন্দোলন করেছে রংপুরবাসী। এর প্রেক্ষিতে কিছু উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন হলেও তা চালু হয়নি। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর সরকার বগুড়া থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ লাইনের উদ্বোধন করলেও এখন পর্যন্ত রংপুরে গ্যাস পৌঁছেনি। গ্যাস সংযোগ ছাড়াও তারাগঞ্জে নির্মিত পল্লী উন্নয়ন একাডেমি চালু হয়নি। মিঠাপুকুরের ইকোপার্ক সংস্কারের অভাবে বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার, হাইটেক পার্ক, আধুনিক রেলস্টেশন, ইপিজেড, বিসিক শিল্পনগরী, এসব প্রকল্পের কাজ চলছে কচ্ছপ গতিতে। রংপুর-ঢাকা মহাসড়রে এলেঙ্গা-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানো হলেও এখনও শেষ করতে পারেনি সড়ক ও জনপথ বিভাগ। মিঠাপুকুরের শঠিবাড়ি, গাইবান্ধার পলাশবাড়ি ও গোবিন্দগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলোর কাজ এখনও চলছে।
রংপুরে আধুনিক রেলস্টেশন নির্মাণসহ রেলের উন্নয়নসহ দিনাজপুর-পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণের কথা ছিল। প্রকল্প পাস হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। গঙ্গাচড়ায় তিস্তার পাড়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা পরিদর্শন করলেও সেই উদ্যোগও থেমে গেছে। কাউনিয়ার টেপামধুপুরে ইপিজেড নির্মাণের জন্য জায়গাও চূড়ান্ত করা, নগরীর পার্শ্ববর্তী দমদমা ব্রিজ এলাকায় দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তা আলোর মুখে দেখেনি। পীরগঞ্জের খালাশপীরে সন্ধান পাওয়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলন কার্যক্রমের অগ্রগতি নেই। রংপুর বিটিভি উপকেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র হিসেবে চালুও হয়নি। ঐতিহ্যবাহী শ্যামাসুন্দরী খালের উন্নয়ন কার্যক্রম এখনও দৃশ্যমান হয়নি।
উত্তরের পাঁচ জেলার মানুষের প্রাণের দাবি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি বহুবার দেওয়া হলেও এখনও তার বাস্তব রূপ দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার আগামী বছরে কাজ শুরুর ঘোষণা দিলেও তিস্তাপাড়ের মানুষ আশ্বস্ত হতে পারছে না।
পতিত আওয়ামী সরকার রংপুরের সঙ্গে যেমন বৈষম্যমূলক আচরণ করেছিল, তেমনি গণঅভ্যুত্থানের পর একনেক সভা ও বাজেটে রংপুরের উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হয়েছে। যদিও প্রধান উপদেষ্টা রংপুরকে এক নম্বর জেলা হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু গত এক বছরেও বড় কোনো প্রকল্প গ্রহণ না করায় এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে হতাশা বাড়ছে।
শিক্ষক সামসুল আলম বলেন, বিগত দিনে ভোট নিয়ে সরকার রংপুরবাসীকে শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেনি। ভেবেছিলাম এবার বাজেটে রংপুরের জন্য বড় বরাদ্দ রাখা হবে। কিন্তু বিগত দিনের মতোই রংপুরের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হচ্ছে।
মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট জোবাইদুল ইসলাম বলেন, আমরা ভেবেছিলাম আবু সাঈদের জেলা রংপুরের উন্নয়নে অন্তর্বর্তী সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কিন্তু এক নম্বর জেলা গড়ে তোলা তো দূরের কথা, যে সমস্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে সেগুলো চালুর ব্যাপারেও এ সরকার ও আমলাতন্ত্র উদাসীন। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, উন্নয়ন প্রকল্পে বৈষম্য ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান ঘটিয়ে অবিলম্বে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
রংপুর মহানগর সুজনের সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ২০৩০ সালে এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এসডিজি’র স্লোগান হলো কাউকে পিছিয়ে রেখে নয়। তাই রংপুরের উন্নয়নকে পিছিয়ে রেখে জাতীয় উন্নয়নসহ এসডিজি অর্জন করা সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে সরকারিভাবে যেসব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন হয়েছে তা দ্রুত চালু এবং যেগুলো প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে তা বাস্তবায়নের জোর দাবি জানাচ্ছি। নইলে রংপুরের জনসাধারণ আবারও রাস্তায় নামতে বাধ্য হবে।