কক্সবাজার অফিস
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ২২:১০ পিএম
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তিন দিনের আন্তর্জাতিক সংলাপ মঙ্গলবার শেষ হয়েছে। যেখানে ৪০ দেশের প্রতিনিধি, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি মিশনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছেন। এই সংলাপটি নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো আশা করছেন না বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সংলাপে যে হয়েছে তাতে প্রত্যাবাসন নিয়ে খুব বেশি আশা করা যায় না। তবে এ সংক্রান্ত বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে আলোচনা বা ঐক্যবদ্ধ একটি প্রচেষ্টা শুরু হবে। এই সংলাপের কারণে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে যে অর্থ সংকট দেখা দিয়েছে তা বিশ্ববাসীর দৃষ্টিগোচর করা সম্ভব হয়েছে। এতে অর্থ সংকট নিরসনের আশা করা যাবে।
২৪ আগস্ট রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান খুঁজতে ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে কক্সবাজারে তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘স্টেকহোল্ডার্স’ ডায়লগ শিরোনামে টেকঅ্যাওয়ে টু দ্য হাই-লেভেল কনফারেন্স অন দ্য রোহিঙ্গা সিচুয়েশন শুরু হয়, যা শেষ হয়েছে ২৬ আগস্ট মঙ্গলবার।
সম্মেলনের প্রথম দিন ২৪ আগস্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে এক শত নারী-পুরুষের সঙ্গে আলোচনা ও মতামত গ্রহণ করছেন অংশগ্রহণকারীরা। মূলত স্বদেশে ফেরতে রোহিঙ্গা ভাবনা, ক্যাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি ধারণা তৈরি করা হয়। দ্বিতীয় দিন ২৫ আগস্ট দিনব্যাপী নানা কর্মশালা হয়েছে। যেখানে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ওই দিন প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে সাত দফা প্রস্তাব করেন। এই সাত দফা প্রস্তাব হলো, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে রাখাইনে একটি নিরাপদ জোন গঠন করে সেখানে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে বাধ্য করা। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি।
শেষ দিন ২৬ আগস্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আন্তর্জাতিক এই সম্মেলন। শেষ দিন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন ৪০ দেশের প্রতিনিধিসহ অংশ গ্রহণকারী দেশি-বিদেশি প্রতিনিধিরা। এ সময় তারা রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শোনেন।
এ প্রসঙ্গে আলাপ হয়েছে অভিবাসন ও রোহিঙ্গা বিশেষজ্ঞ গবেষক আসিফ মুনীরের সঙ্গে। তিনি জানান, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদে অধিবেশনের সাইড লাইনে রোহিঙ্গা বিষয়ে একটা বৈঠক হবে। যেখানে অংশ নেবেন জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসহ ১০৭ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। আরেকটি হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রস্তাবে গত বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাইড লাইনের বৈঠকে ড. ইউনূস যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তার প্রেক্ষিতে ডিসেম্বরে কাতারে যে সম্মেলন হতে যাচ্ছে সেখানে বৈঠকের একটি প্রস্তুতি।
তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরে সাইড লাইনে সভা খুব বেশি দেরি নেই। সেখানে সরাসরি ফিডব্যাক দেওয়ার একটা সুযোগ বাংলাদেশের পক্ষে। ইতোমধ্যে দেখেছি ২৫ আগস্ট বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র যৌথভাবে বিবৃতি দিয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে তারা ঐক্যবদ্ধ। বাংলাদেশের পাশে আছে।
আসিফ মুনীর বলেন, সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে আমরা বুঝি প্রত্যাবাসনসহ এর রাজনৈতিক সমাধান, কূটনৈতিক সমাধান। সব ব্যাপারেও তারা বাংলাদেশের সঙ্গে আছেন। যদিও সেটা কতটা কার্যকর হবে তা বলা যাচ্ছে না। ইউরোপীয় কয়েকটি দেশ বক্তব্য দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা যাদের বেশি মেটার করে তাদের বক্তব্য দেখিনি। কাজেই প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে কি না সেটা সময়ের ব্যাপার।
এখানে মিয়ানমার কতটা অংশগ্রহণ করবে সেটাও একটা ফ্যাক্টর মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, এখানে মিয়ানমারকে ছাড়া আন্তর্জাতিক মহল যতই আলাপ করুক না কেন সেখান থেকে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা খুবই কঠিন। মিয়ানমারেও এখন যে অবস্থা সেখানে তারাও এ বিষয়ে আলাপ করতে আগ্রহী হবে বলে মনে হয় না। তারপরেও একটা যদি কর্মকৌশল বা রোডম্যাপ তৈরি করা হয়, এটা ধরে কিছুটা হলেও আগানো যাবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষক মেজর অবসরপ্রাপ্ত এমদাদুল ইসলাম জানান, সম্মেলনটি ঘিরে প্রত্যাবাসনের কোনো আশা করা যাচ্ছে না। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যে অর্থ সংকট রয়েছে তা নিরসনে ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, এখানে যে আলোচনা হয়েছে তা আরও আলোচনার পথ তৈরি হবে। রোহিঙ্গা সংকটটি বিশ্ববাসী ভুলে যেতে উপক্রম হয়েছে। এখন নতুন আলোচনা করে দৃষ্টিগোচর করা সম্ভব হবে।