সুনামগঞ্জ
সাইদুর রহমান আসাদ, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ১৭:৫৪ পিএম
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ১৮:১৭ পিএম
সুনামগঞ্জ পৌরশহরের চারটি বেসরকারি হাসপাতালে গত ছয় মাসে নরমাল ডেলিভারি চেয়ে সিজারিয়ান ডেলিভারি হয়েছে সাত গুণ। জেলা সদর হাসপাতালে জরুরি রোগীদের ভর্তি না রাখায় সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে শিশু জন্মদান পদ্ধতিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলো ব্যবসার হাতিয়ারে পরিণত করেছে। এজন্য এর প্রবণতাও বাড়ছে বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা। যে হারে সিজারিয়ান ডেলিভারি হচ্ছে, এটাকে উদ্বেগজনক বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
জেলা পৌরশহরে বেসরকারি হাসপাতাল পাঁচটি। এর মধ্যে নবীনগরে খন্দকার আলকাছ আমিনা হাসপাতালে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে কোনো গর্ভবতী মায়ের সন্তান প্রসব হয়নি। তবে হাসননগরে হেলথ কেয়ার পলি ক্লিনিকে নরমাল ডেলিভারি হয়েছে ১০টি, সিজারিয়ান ডেলিভারি হয়েছে ২৫৫টি, কাজীর পয়েন্টে আর অ্যান্ড এম জেনারেল হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারি হয়েছে ৮৭টি এবং অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্চা হয়েছে ৪৮৩টি, উকিলপাড়ার সুরমা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নরমাল ডেলিভারি হয়েছে ২০টি ও অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্চা হয়েছে ১২০টি, হাসননগরের আনিছা হেলথ কেয়ার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নরমাল ডেলিভারি হয়েছে ৩৪টি ও অপারেশনে হয়েছে ২৩০টি বাচ্চা।
এই চারটি হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারি হলো ১৫১টি আর অপারেশনের মাধ্যমে ডেলিভারি হয়েছে ১ হাজার ৮৮টি। হিসেবে করলে দেখা যাবে নরমাল ডেলিভারি থেকে প্রায় সাত গুণ বেশি।
এদিকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে গত ছয় মাসে নরমাল ডেলিভারি হয়েছে ১ হাজার ৩৭টি ও সিজারিয়ান ডেলিভারি হয়েছে ২০২টি। ভুক্তভোগীরা বলছেন, সদর হাসপাতালে জরুরি প্রসূতি মায়েদের চিকিৎসা করানো হয় না। গরিব অসহায় মানুষ ভর্তি করাতে চাইলেও অভিভাবকদের কাছে আগেই রিস্কবন্ড নেওয়া হয়। এ কারণে ভয়েই অনেকে হাসপাতাল ছাড়েন। এই সুযোগে ক্লিনিকগুলোর মূল ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে সিজারিয়ান অপারেশন।
হাসননগরের বাসিন্দা নুরুদ্দিন বললেন, সরকারি হাসপাতালে ভালো করে দেখে না। সেবার মান ভালো নয়। এজন্য প্রাইভেট হাসপাতালে আমার মেয়ের প্রথম বাচ্চা সিজারে হয়েছে।
সুনামগঞ্জ সদরের গৌরারং ইউনিয়নের ভাটি সাফেলা গ্রামের বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন, জেলা সদর হাসপাতালে সেবার মান ভালো নয়। ভোগান্তি আর ভোগান্তি। এজন্য জেনারেল হাসপাতালে স্ত্রীকে ভর্তি করিয়েছি। এখানে সিজার করাতে ডাক্তার ও রুম ভাড়ার জন্য গুনতে হয়েছে ২১ হাজার টাকা।
সুনামগঞ্জ সদরের মোহনপুর গ্রামের বাসিন্দা তাজির উদ্দিন বললেন, জেলা সদর হাসপাতালের গাইনি বিভাগের স্টাফদের আচরণ ভালো নয়। এজন্য কেউ হাসপাতালে যেতে চায় না।
সদর হাসপাতালের গাইনি বিভাগের চিকিৎসক ডা. লিপিকা দাস বলেন, অনেক সময় ডেলিভারির রোগীরা শেষ সময়ে বাচ্চা খারাপ করে হাসপাতালে নিয়ে আসে। তখন তাদের ইমার্জেন্সি সিজার করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, মাতৃত্বকালীন নানা জটিলতায় সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিশুর জন্ম সিজারিয়ান পদ্ধতিতে হতে পারে। এই সংখ্যা এর বেশি হওয়া উচিত নয়।
সুনামগঞ্জের একাধিক চিকিৎসক বলেছেন, অনেকেই মনে করেন নরমাল হতে গিয়ে হয়তো বা বার্থ ক্যানেল কোনোরকম আঘাত তার পরবর্তী মেলামেশায় অসুবিধা হতে পারে। এটি ঠিক নয়। সিজার করার আগেও সিজারের সুবিধা-অসুবিধাগুলো বিস্তারিত বলা প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের লেকচারার ডা. আতিফ ইবনে সাঈফ বলেন, অনেক রোগী শেষ সময়ে হাসপাতালে আসেন। তাদের ক্ষেত্রে সিজার অপরিহার্য হয়ে পড়ে। নয়তো অন্য জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ধরনের রোগীদের সিজার করতেই হবে।
জেলা সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. সুমন বণিক বলেন, হাসপাতালে রোগীদের সঙ্গে ভালো আচরণই করা হয়। অফিস টাইমের পরে জরুরি রোগী এলে বেসরকারি হাসপাতালে পাঠাতেই হয়। এটি যিনি করেছেন, কোন পরিস্থিতিতে, কেনো করেছেন তিনিই ভালো বলতে পারবেন।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, সুনামগঞ্জসহ দেশে বেসরকারি হাসাপাতালে সিজার বা অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্চা প্রসবের পরিমাণ বেশি। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের সংখ্যা বেশি। বেসরকারি হাসাপাতালে অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্চা হওয়ার সঙ্গে ব্যবসায়ীক স্বার্থ জড়িত।