আহমদ মারুফ, সিলেট
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৫ ০৮:৫৮ এএম
প্রবা ফটো
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি সিলেট। সীমান্তের কোল ঘেঁষে পাহাড়-মেঘ-নদীর অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে পর্যটন স্পট ‘সাদা পাথর-এ। এটি বাংলাদেশের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোর একটি। এখানে স্বচ্ছ জলের নিচে দেখা মেলে সাদা পাথরের। সেই সঙ্গে চারপাশের সবুজ পাহাড় আর দিগন্তজোড়া নীলাকাশের ভাসমান মেঘ যেন তৈরি করে অন্যরকম এক অনুভূতি।
সম্প্রতি সেই অনুভবে আঁচড় ফেলে কতিপয় দুষ্কৃতকারী। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে লুটে নিয়ে যায় কয়েকশ কোটি টাকার সাদা পাথর। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়া এবং স্থানটির নান্দনিকতা হারানোর আশঙ্কায় পর্যটন সংশ্লিষ্ট অনেকেই শংকায় পড়েন। সিলেট জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে লুট হওয়া পাথর পুনঃস্থাপনের কাজ। উদ্ধার করা পাথর ফের মূল এলাকাতে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য অনেকটাই ফিরবে বলে আশা।
সিলেটের নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘আমরা এই এলাকা রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। একদিকে পর্যটন অব্যাহত রাখতে চাই, অন্যদিকে প্রকৃতি ও পরিবেশ যেন নষ্ট না হয়, সেটাও নিশ্চিত করছি।’
সাদা পাথরসহ সিলেটের বিভিন্ন পর্যটন স্পট থেকে লুট হওয়া পাথর উদ্ধারে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযানে টানা ১২ দিনে এখন পর্যন্ত ১২ লাখ ঘনফুট পাথর উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে ৭ লাখ ঘনফুট।
লুট হওয়া পাথর ফিরিয়ে দিতে জেলা প্রশাসনের তিন দিনের আল্টিমেটামের প্রথম দিনে ফিরেছে ২ লাখ ঘনফুট পাথর। সিলেট সদর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা থেকে লোকজন স্বেচ্ছায় সাদাপাথর এলাকায় গিয়ে পাথরগুলো জমা দিয়ে আসেন। এই ঘোষণার পর এখন পর্যন্ত ২৫ লাখ ঘনফুট পাথর উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রবিন মিয়া।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৮ সালে ‘বেলা’সহ কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠনের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন পাথর কোয়ারি পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। এসব স্থান থেকে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করে সরকার। এরপর থেকে কাগজ-কলমে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবের চিত্র ছিল উল্টো। তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে পাথর উত্তোলন করতেন। সেই সময় মাঝে মাঝে নামকাওয়াস্তে অভিযান হলেও কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
-68ad22de78feb.jpeg)
গত বছরের ৫ আগস্টের পর সিলেটের সাদা পাথর লুটপাট হয়েছে সবচেয়ে বেশি। টাস্কফোর্সের অভিযান ও পাথরখেকোদের লুকোচুরি ছিল নিত্যদিনের চিত্র। পাথরকাণ্ডে কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরে বেশ কয়েকজন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী বহিষ্কৃত হন। কারাগারেও গেছেন বিএনপির কেউ কেউ। এরপরও থেমে থাকেনি পাথর লুটপাট।
স্থানীয়রা জানান, চলতি আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে সাদাপাথরসহ সিলেটের সকল পর্যটন স্পটে পাথর লুটে রীতিমতো হরিলুটের ঘটনা ঘটে। দিন-রাত সমানতালে হাজার হাজার শ্রমিক কোদাল, বেলচা, শাবল আর টুকরি নিয়ে কোয়ারি ও এর আশপাশের এলাকায় গিয়ে মাটি খুঁড়ে পাথর বের করেন। কয়েকদিনের প্রকাশ্যে পাথর লুটপাটের ঘটনা সামাজিক ও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সাদাপাথর ও জাফলং পর্যটনকেন্দ্রের লাখ লাখ ঘনফুট পাথর লুটের ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয় সারা দেশে। নড়েচড়ে বসে সরকার। এমনকি রিট হয় উচ্চ আদালতেও। আদালত লুণ্ঠিত পাথর উদ্ধার করে যথাস্থানে প্রতিস্থাপনের নির্দেশ দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ আগস্ট সিলেট সার্কিট হাউসে সিলেট বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রশাসনের সর্বস্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় পাথর লুট ঠেকানো ও লুটের পাথর পুনঃস্থাপনে পাঁচ দফা সিদ্ধান্ত হয়।
সিদ্ধান্তগুলো হলোÑ জাফলং ইসিএ এলাকা ও সাদাপাথর এলাকায় ২৪ ঘণ্টা যৌথ বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জে পুলিশের চেকপোস্টে যৌথ বাহিনীসহ সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে। অবৈধ ক্রাশিং মেশিনের বিদ্যুৎবিচ্ছিন্নসহ পাথর উত্তোলন বন্ধে অভিযান চলমান থাকবে। পাথর চুরির সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। চুরি হওয়া পাথর উদ্ধার করে পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হবে। একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়।
পাথর লুটের ঘটনায় সিলেটের জেলা প্রশাসক শের মো. মাহবুব মুরাদকে প্রত্যাহার করা হয়। বদলি করা হয় কোম্পানীগঞ্জের ইউএনওকে। খনিজ সম্পদ ব্যুরোর পক্ষ থেকে ২০০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা হয়।
এদিকে সাদা পাথর লুটের ঘটনায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে আগামী ১০ দিনের মধ্যে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত শুক্রবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস-উর-রহমানের নেতৃত্বে মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে আসে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদল। তারা সাদাপাথর এলাকা পরিদর্শন করেন। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেন।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানান, লুটপাটের ঘটনার পর যৌথ বাহিনীর অভিযান ও প্রশাসনিক তৎপরতায় এখন পর্যন্ত লুট হওয়া প্রায় ১২ লাখ ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিস্থাপন হয়েছে ৭ লাখ ঘনফুট। বাকিগুলো প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া চলমান। সিলেটের সকল পর্যটন স্পটের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে এবং লুটকৃত পাথর উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।