মীর ফাহাদ, ভালুকা (ময়মনসিংহ)
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৫ ০৯:১৭ এএম
প্রবা ফটো
মরুভূমি নেই কিন্তু চাষ হচ্ছে মরুর ফল খেজুর। দৃষ্টিনন্দন বাগানে সারি সারি গাছে দুলছে সবুজ পাতা। কিছু গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে পাকা খেজুর। বাগানের অর্ধেকের বেশি অংশ জুড়ে চারাগাছ। কয়েকজন এসব গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত। ময়মনসিংহের ভালুকায় মরুর খেজুর চাষে বাজিমাত করেছেন আবদুল মোতালেব। হবিরবাড়ি ইউনিয়নের পাড়াগাঁও গ্রামে সাত বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন খেজুর বাগান। এই খেজুর বাগান ভাগ্য বদলে দিয়েছে তার। একসময়ের মাটির ঘর হয়েছে দোতলা ভবন। কিনেছেন কয়েক বিঘা জমি, যার মূল্য কোটি টাকার ওপরে। একটা সময়ে তাকে নিয়ে উপহাস করা লোকজনও এখন তাকে ‘কোটিপতি খেজুর মোতালেব’ নামে ডাকেন।
পাড়াগাঁওয়ের নূরুল ইসলামের ছেলে আব্দুল মোতালেব ২০০১ সালে সৌদি আরব থেকে খেজুরের বীজ এনে স্বপ্নের এই বাগান গড়েন। তার দাবি, দেশে তিনিই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে সৌদি আরবের খেজুরের চাষ শুরু করেন। এ ছাড়া ‘লিপজেল’ নামে সুস্বাদু খেজুরের নতুন জাতও উদ্ভাবন করেছেন তিনি। বর্তমানে খেজুর ও গাছের চারা বিক্রি করে তার বছরে আয় ৩০ লাখ টাকা।
মোতালেবের খেজুর বাগানে গিয়ে দেখা যায় অপূর্ব দৃশ্য। গাছে গাছে পলিথিনে মোড়ানো খেজুর। কিছু পাকা, কিছু আধাপাকা। ছোট গাছের খেজুর মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছে। বড় গাছের খেজুর পাড়তে গাছের সঙ্গে লোহার মই বসানো হয়েছে। যারা বাগান দেখতে আসছেন, তাদের বিনামূল্যে খেজুর খাওয়াচ্ছেন মোতালেব। দেশের মাটিতে সুমিষ্ট সৌদি খেজুরের স্বাদে মুগ্ধ সবাই।
সফল খেজুরচাষি মোতালেবের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। সংসারের হাল ধরতে পাড়ি দেন সৌদি আরবে। ১৯৯৮ সালে আলকাসিন শহরে আশরাফ আলীর খেজুর নার্সারিতে যোগ দেন। দুই বছর সেখানে কাজ করেন। তখনই তিনি নিজ দেশে আরবের খেজুর চাষের স্বপ্ন দেখেন। ২০০০ সালের শেষদিকে দেশে ফেরার সময় মালিকের কাছ থেকে চেয়ে নেন ৩৫ কেজি খেজুর। এজন্য মালিক তার ৬ মাসের বেতন কেটে রেখেছিলেন। ওই খেজুর থেকে তিনি ৩০০টি বীজ পান। এসব বীজ বস্তাবন্দি করে রাখেন। ২৫-৩০ দিনের মাথায় এসব বীজ থেকে ২৭৫টি চারা গজিয়ে ওঠে। ২০০১ সালে বাড়ির সামনে ১০ কাঠা জমিতে চারাগুলো রোপণ করেন তিনি। বাগানের নাম দেন ‘মোফাজ্জল সৌদিয়া খেজুর প্রকল্প’। পরবর্তীতে কিছু চারা নষ্ট হয়ে যায়। মোতালেব ২৫৫টি খেজুর গাছের সন্তানের মতো যত্ন নিতে থাকেন।
তিনি আরও জানান, গাছে প্রথম খেজুর ধরে ২০০৬ সালে। এরপর থেকে চারা বিক্রি শুরু হয়। বীজের চারা ১-৮ হাজার টাকায় বিক্রি করি। তবে বীজের চারার গ্যারান্টি নেই। কাটিং করা প্রতিটি চারা ১৫ হাজার থেকে দুই লাখ টাকায় বিক্রি করি। এ চারা বিক্রির সময় অনেককে স্ট্যাম্পে লিখিত দিই। কারণ এ চারা মরে না। দেশের যেকোনো জায়গায় এ খেজুর গাছ লাগালে হবে। বছরে একেক গাছে ৫০-৬০ কেজি খেজুর পাওয়া যায়।
প্রতিবছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে খেজুর গাছে মুকুল আসে। জুন-জুলাই ও সেপ্টেম্বরে ফলন শেষ হয়। তার বাগানে সৌদি আরবের আজোয়া, শুক্কারি, আম্বার ও মরিয়ম জাতের খেজুর গাছ রয়েছে। প্রতিকেজি আজোয়া তিন হাজার টাকা, শুক্কারি এক হাজার টাকা, আম্বার আড়াই হাজার টাকা ও মরিয়ম খেজুর ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন তিনি।
মোতালেব বলেন, আমি গবেষণা করে ‘লিপজেল’ নামে নতুন জাতের খেজুর গাছ উদ্ভাবন করেছি। এ গাছের খেজুরের স্বাদ অতুলনীয়। বর্তমানে লিপজেল জাতের ফলদ গাছ রয়েছে ১৯টি। এই খেজুর কেজিপ্রতি চার হাজার টাকা বিক্রি করি।
মোতালেব জানান, ২০০৪ সালের জুলাইয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও তার বাগান পরিদর্শন করেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তার বাগান পরিদর্শনে আসেন।