হাসিব আল আমিন, নোয়াখালী
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৫ ১২:০৪ পিএম
হাতিয়ায় নৌ-অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় এভাবেই রোগীকে হাসপাতালে নিতে হয়। সম্প্রতি তোলা। - প্রবা ফটো
রাত গভীর। উত্তাল মেঘনার ঘাটে এক অন্তঃসত্ত্বা মা প্রসব ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। চারপাশে উদ্বিগ্ন মানুষ দৌড়ঝাঁপ করছেন। কিন্তু নেই সেই জীবন রক্ষাকারী নৌ-অ্যাম্বুলেন্স। শেষ ভরসা হয়ে ওঠে ভাড়ায় নেওয়া একটি কাঠের নৌকা। নদীর ঢেউ পাড়ি দিতে দিতেই জন্ম নিল এক শিশু। কিন্তু মাকে আর ফিরিয়ে আনা গেল না। হাতিয়ায় প্রায়ই এমন মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় প্রায় সাত লাখ মানুষ রয়েছেন। এখানে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মাত্র ৫০ শয্যার একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দিয়ে চলছে চিকিৎসা। সেখানে পর্যাপ্ত ডাক্তার নেই। নেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতিও। প্রতি মাসে গড়ে ৬০-৭০ জন গুরুতর রোগীকে নোয়াখালীর সদর হাসপাতালে পাঠাতে হয়। আরও শতাধিক রোগী নিজের খরচে যান সদর হাসপাতালে। কিন্তু হাতিয়া থেকে যাওয়া সুখকর কোনো ব্যাপার নয়।
দ্বীপবাসীর জরুরি চিকিৎসা সেবার জন্য ২০১৯ সালে স্বাস্থ্য বিভাগ একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে। কিন্তু অল্পদিনেই তা অকেজো হয়ে পড়ে। পরে ২০২২ সালে ব্যবস্থা করা হয় আরেকটি আধুনিক নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের।
স্থানীয়দের মনে আশার আলো জ্বলে উঠলেও কিছুদিনের মধ্যে নিরাশ হতে হয়। চালক, জ্বালানি আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি দুই বছর ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে।
কোটি টাকার দুটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্সে ধরছে মরিচা। অথচ রোগীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন কাঠের নৌকায় চড়ে সদর হাসপাতালে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নদী পার হচ্ছেন।
নলচিরা ঘাটের বাসিন্দা আবু সালেহ সাদ বলেন, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স শুধু একটি নৌযান নয়। এটি জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক হতে পারত। কিন্তু সেটি হতে পারেনি। অনেক মা ঘাটেই সন্তান জন্ম দিয়েছেন। অনেকে নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে জীবন হারিয়েছেন। যদি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সচল থাকত। তাহলে অনেকে প্রাণ বেঁচে যেত।
আরেক বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স আছে। কিন্তু তা সেবায় নেই। রাতে যখন রোগী আসে, কাঠের নৌকাই ভরসা। ঢেউ আর আঁধারের কারণে সময় মতো হাসপাতালে পৌঁছানো যায় না। এই দেরিতে অনেক প্রাণ ঝরে যায়।
তিন বছর নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালান জাকের হোসেন কালু। তিনি বলেন, আমি দিনে পাঁচ-সাতজন রোগী পার করেছি। কত মা নৌ-অ্যাম্বুলেন্সই সন্তান জন্ম দিয়েছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মানসী রানী সরকার বলেন, একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স অনেক আগেই অকেজো। আরেকটি চালকের অভাবে বন্ধ দীর্ঘদিন। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। দ্রুত লোকবল নিয়োগ হলে আবারও এ সেবা চালু করা সম্ভব হবে। নৌ-অ্যাম্বুলেন্স পেলে দ্বীপের হাজারো মানুষ উপকৃত হবেন।