আবদুল্লাহ আল-মামুন, ফেনী
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৫ ১১:২৯ এএম
আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৫ ১১:২৯ এএম
ফেনীর ফুলগাজীতে মহাত্মা গান্ধীর হাতে গড়া ঐতিহাসিক গান্ধী আশ্রমটি আজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর হাতে ১০৬ শতক ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত জনবহুল এ আশ্রম এখন সব সময় সুনসান নীরবতা। একসময়ের কর্মচঞ্চল এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে শুধু স্বল্প পরিসরে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালিয়েই টিকে আছে। হস্তচালিত তাঁত শিল্পসহ বহু কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আশ্রমজুড়ে বিরাজ করছে নীরবতা আর অচলাবস্থা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯২১ সালের ৩১ আগস্ট মহাত্মা গান্ধী নিজ হাতে ফুলগাজীর বীরচন্দ্র বাজারে (বর্তমানে নতুন মুন্সিরহাট) গান্ধী আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। ১০৬ শতক জমির ওপর গড়ে ওঠা এ আশ্রমে খাদি হস্তশিল্পের পাশাপাশি স্থানীয়দের মাঝে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আত্মনির্ভরতা, মাদকবিরোধী অভিযান, বাল্যবিবাহ নিরোধসহ নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো হতো। হস্তচালিত তাঁতে তৈরি হতো ধুতি, লুঙ্গি, গামছা, শাড়িসহ নানা ধরনের কাপড়, যা স্থানীয়দের চাহিদা পূরণ করত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে যায় তাঁত শিল্পটি। নষ্ট হয়ে যায় সচল হস্তচালিত তাঁত যন্ত্র। যুদ্ধের পর বেশ কিছু তাঁতিরা জীবিকার তাগিদে চলে যায় কলকাতায়। পরবর্তীতে দেশভাগের পর স্থানীয় তাঁতিদের উদ্যোগে পুনরায় তা সচল করা হলেও আধুনিক প্রযুক্তির কারণে হস্তচালিত তাঁতের কদর কমে যায়। ২০১৩ সালে ভারতীয় উপরাষ্ট্রদূত সন্দীপ চক্রবর্তীর উদ্বোধনে আবারও চালু করা হয় ৮টি তাঁত যন্ত্র। কয়েক বছর চালু থাকার পর ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় তাঁতযন্ত্র ও চরকাগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এখন পুরো আশ্রম এলাকা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পরিত্যক্ত হওয়ায় এখন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে রূপ নেয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ট্রাস্ট অফিসের একটি জরাজীর্ণ টিনশেড ভবনের এক কোণে মাত্র ৪ জন কর্মকর্তা সীমিত পরিসরে ঋণ কার্যক্রম চালাচ্ছেন। প্রশিক্ষণ ভবন, তাঁত ঘরসহ অধিকাংশ অবকাঠামো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর পরিত্যক্ত থাকায় ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে রূপ নিয়েছে একসময়ে কর্মচাঞ্চল্যের এসব দালান।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল আউয়াল জানান, এই আশ্রমই একসময় এলাকার মানুষকে স্বনির্ভরতা, স্বাস্থ্যবিধি ও শিক্ষার ব্যাপারে সচেতন করেছে। এখান থেকেই প্রথম স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট বসানো হয়। এখন আর সেই কার্যক্রম নেই, মানুষও আসে না।
গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের নতুন মুন্সিরহাট শাখা ব্যবস্থাপক সুবিমল দাস বলেন, তাঁত শিল্পে যান্ত্রিকীকরণের পর হস্তচালিত কার্যক্রমে তাঁতিদের অনাগ্রহে এটি এক পর্যায়ে ঝিমিয়ে পড়ে। পরে বন্ধ হয়ে যায়। একসময় আশ্রমের মাধ্যমে নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম চললেও বর্তমানে আমরা কেবল ঋণ কার্যক্রম চালাচ্ছি। বর্তমানে আমরা ৪ জন এ অফিসে কর্মরত রয়েছি। গত বছরের বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় কিছু প্রকল্প বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে। এখন ঋণ কার্যক্রম ছাড়া অন্য কোনো প্রকল্প আমাদের হাতে নেই। তবে নতুন প্রকল্প চালুর বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ফেনী জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি শুকদেব নাথ তপন বলেন, গান্ধী আশ্রম এই জনপদের আত্মনির্ভরতা ও সচেতনতার প্রতীক। এর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়া অত্যন্ত দুঃখজনক। ট্রাস্ট অথবা সরকারি-বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় উজ্জীবিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করার দাবি জানাচ্ছি। এটি সক্রিয় হলে এলাকার মানুষ সচেতন হবে, জীবনমান বৃদ্ধি পাবে।