এম.এ হান্নান, বাউফল
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৫ ১১:৪১ এএম
বাংলার রূপালি স্বপ্ন ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে এখন। প্রতি বছর এই সময়ে তেঁতুলিয়া নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ে ইলিশ, সরব হয়ে ওঠে জেলেপাড়া, জমে ওঠে মাছের বাজার। কিন্তু এ বছরের চিত্র যেন একেবারেই উল্টো। নদীতে মাছ নেই, জাল ফেলে খালি হাতে ফিরছেন জেলেরা। বুকভরা আশা নিয়ে নদীতে নামলেও প্রতিবারই হতাশায় ফিরে আসতে হচ্ছে। ফলে চরম দুরাবস্থায় পড়েছেন উপকূলীয় পটুয়াখালীর বাউফল অঞ্চলের জেলে ও ব্যবসায়ীরা। ইলিশের এই অভাব শুধু জীবিকায় নয়, প্রভাব ফেলছে পুরো এলাকার অর্থনীতিতে।
জেলে ও ব্যবসায়ীরা জানান, মেঘনা থেকে উৎপত্তি হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে তেঁতুলিয়া নদী। এ নদীর ১০০ কিলোমিটার এলাকা ইলিশের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর এপ্রিল-মে দুই মাস এই ইলিশ অভয়াশ্রমে সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে। জুলাই থেকে অক্টোবর ইলিশের ভরা মৌসুম। প্রতি বছর এই সময় তেঁতুলিয়া নদীতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ে। তবে এ বছরে চিত্র একেবারেই ভিন্ন। যে কয়কটা পাওয়া যায় তা বিক্রি করে খরচই উঠছে না। এতে হতাশ জেলেরা।
চন্দ্রদ্বীপ এলাকার জেলে সুজন হাওলাদার বলেন, ইলিশের এমন আকাল কোনো বছর দেখিনি। নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। একটি ট্রিপ দিতে খরচ হয় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা, অথচ মাছ বিক্রি করে পাওয়া যায় মাত্র ২-৩ হাজার টাকার। আমরা জেলেরা চরম কষ্টে আছি।
ফোরকান মাঝি নামে এক ট্রলার মালিক বলেন, আমার ট্রলারে ১২ জন জেলে। প্রতিবার ট্রিপে খরচ হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু মাছ ধরি ১০-১২ হাজার টাকার। এমন অবস্থা চলতে থাকলে মরণ ছাড়া উপায় থাকছে না।
কালাইয়া বন্দরের মৎস্য ব্যবসায়ী মিন্টু বলেন, প্রতি বছর এই সময় ৫০-৬০ ককসেট মাছ আড়তে আসত। এ বছর ১০-১২ ককসেটও হয় না। লাখ লাখ টাকা দাদন দেওয়া আছে জেলেদের। তারা মাছ পাচ্ছে না, আমরাও ব্যবসা করতে পারছি না। আমরা মহাবিপদে আছি।
নদীতে মাছ কম থাকায় বাজারে ইলিশের দাম বেড়েছে হু-হু করে। ভোক্তারা বলছেন, ইলিশ এখন স্বপ্নের খাবার। বাজারে প্রতি কেজি দেড় কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২৮০০ টাকা, ১ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২৪০০ টাকা, কেজি ওজনের মাছ ২২০০ টাকা, ৮০০ গ্রামের ইলিশ ১৯০০ টাকা এবং ৬০০ গ্রামের মাছ বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ টাকায়। মধ্যবিত্ত পরিবার তো দূরের কথা, দরিদ্র মানুষ ইলিশের পানা দেখারও সুযোগ পাচ্ছে না।
তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রজনন মৌসুমে অবৈধ জাল ব্যবহার করে ইলিশের ডিম ও পোনা নিধন করা হয়। কিছু অসাধু মৌসুমি জেলে নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সঙ্গে আঁতাত করে নদীতে বাঁধাজাল, বেড়জাল, চায়না জাল দিয়ে অবাধে মাছ শিকার করছে। এতে ইলিশের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রতি বছর মাছের পরিমাণ কমছে। যে কারণে মৌসুমে এসে নদীতে ইলিশ থাকে না।
চন্দ্রদ্বীপের জেলে বাবুল ব্যাপারী বলেন, প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কিছু জেলেরা নদীতে অবাধে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছের পোনা ও রেণু ধ্বংস করছে। এসব বন্ধ না করলে নদী থেকে মাছ একেবারে হারিয়ে যাবে।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব আলম তালুকদার বলেন, আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। তবে কিছু অসাধু লোক আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাছ ধ্বংস করছে। লোকবল সংকটের কারণে আমরা সব সময় তা ঠেকাতে পারছি না।
তবে প্রশাসনের কেউ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত— এমন অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমি বা আমার অফিসের কেউ জড়িত না।’
তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশের আকাল প্রসঙ্গে পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং পলি পড়ে নদীর মুখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ইলিশ স্বাভাবিকভাবে পরিভ্রমণ করতে পারছে না। তবে আগস্টের শেষের দিকে সাগরের ইলিশ ডিম ছাড়ার পর নদীতে আসবে বলে আমরা আশাবাদী।