সিলেটে পাথর লুট
আহমদ মারুফ, সিলেট
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৫ ১০:৫৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত
সিলেটে পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র সাদা পাথর ও প্রকৃতি কন্যা জাফলং। স্থান দুটির পাথর লুট হয়েছে। রাজনৈতিক ঐকমত্যের কাছে প্রশাসনের আত্মসমর্পণে এত বড় কেলেঙ্কারি সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
বিএনপি-জামায়াত আর সমন্বয়কদের দল একেবারে বিপরীতমুখী অবস্থানে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমই তো নিষিদ্ধ, প্রকাশ্যে নেই নেতারাও। কিন্তু সিলেটের ভোলাগঞ্জের পাথর লুটে সব দলের নেতারাই এক কাতারে। এখানে কোনো বিরোধ নেই, বরং মিলেমিশেই করেছে লুটপাট। আর পুলিশের বিরুদ্ধে রয়েছে পাথরবাহী ট্রাক আর ট্রাক্টর থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ।
ধলাই নদের পূর্ব পাশে রয়েছে একশর বেশি, আর পশ্চিমে দেড় শতাধিক পাথর রাখার জায়গা। প্রতিটির ভাড়া দিনে ২ হাজার টাকা। তিনজন শ্রমিককে দেওয়া হতো একটি নৌকা। লুট পর পাথর বিক্রি শেষে নৌকার মালিক এক ভাগ, বাকি ৩ ভাগ ওই ৩ শ্রমিকের। যারা জমি ভাড়া নেন, তারা শ্রমিকদের কাছ থেকে পাথরগুলো কিনতেন চার ভাগের এক ভাগ দামে। এক নৌকা পাথরের দাম ৮ হাজার। সেই পাথর তারা কেনেন মাত্র ২ হাজারে! বাকি ৬ হাজার নদীতেই লাভ যাদের, তারাই দৈনিক তুলে নিয়েছেন সোয়া কোটি টাকা করে।
৫ আগস্টের পর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির পদ স্থগিত করা সভাপতি সাহাব উদ্দিন ছিলেন লাভের ক্ষেত্রে শীর্ষে। তারপরই যুবদলের আহ্বায়ক সাজ্জাদ দুদু। এ ছাড়া পূর্ব পাড়ের নেতৃত্ব জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহার আহমেদ রুহেল, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রজন মিয়া, সদস্য গিয়াস মিয়া।
পাথর লুটের ঘটনা সামনে আসায় বিএনপি থেকে পদ হারান সাহাব উদ্দিন। পাথর লুটের ইস্যু সামনে আসার পর বাহার আহমেদ রুহেলও এলাকায় নেই। তার মোবাইল ফোন নম্বরটিও বন্ধ। লুটপাটে আরও ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা কালাইরাগের দুলাল মিয়া, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আমিনুল ইসলাম ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শাহাবুদ্দিন। তারা এখন পলাতক।
পাথর লুটের ঘটনায় সামনে আসে আরও যাদের নাম। পূর্ব পাড়ের জমির দখলদার ও পাথর ব্যবসায়ী তারা। তালিকায় রয়েছে জেলা যুবদল সদস্য মোস্তাকিম আহমেদ ফরহাদ, পূর্ব ইসলামপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আলিমুদ্দিন, উপজেলা বিএনপির সদস্য হাজী কামাল, যুবদলকর্মী আজিজুল মাহমুদ, এজাজ মাহমুদ, শৈবাল শাহরিয়ার সাজন, সালাউদ্দিন, উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান লাল মিয়া, তার ছেলে রিয়াজ উদ্দিন, জৈন উদ্দিন, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন দুদুর ভাই বোরহান, আজিম, উপজেলা যুবদলের সদস্য মানিক মিয়া, আরমান আহমদ, যুবদল নেতা জাহাঙ্গীর আলম, জাকির, ভোলাগঞ্জ গ্রামের মোজাফর, নুরউদ্দিন, মইনউদ্দিন, সালাউদ্দিন, রাজু মিয়া, রনি, কালা মিয়া, রোকন মিয়া, লাল মিয়া, আজিজুল, আহাদ মিয়া, বেরাই, দুলাল, তেরা মিয়া, রনি, পাড়ুয়া নোয়াগাঁও গ্রামের সাইফুল, শফিকুল, বাঘারপার গ্রামের আব্দুল মতিন, দক্ষিণ ঢালারপার গ্রামের আব্দুস সালাম, সিদ্দিক মিয়া, মধ্য রাজনগর গ্রামের লায়েক মিয়া, নয়াগাংগেরপার রাজু, আখলু, ইমরান, তৈমুরনগর গ্রামের রাজ্জাক, জব্বার, আহাদ, লায়েক, ঘোড়ামারা এলাকার আশিক। এ ছাড়া রয়েছে ছাত্রদল নেতা হাফিজুর রহমান হাবিব, মোফাজ্জল হোসেন রোমান, জুবায়ের, হারুনুর রশিদ ও আমিন রহিম। রয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হুমায়ুন আহমেদ হুমন আর সাব্বিরের নামও।
পাথর লুটের বিষয়ে পরিবেশবাদীরা সোচ্চার ছিলেন এসব ঠেকাতে, পারেননি কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বেলার বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আক্তার বলেন, যারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত, তাদের চেহারা পাল্টেছে। কিন্তু অবৈধ কাজ থামেনি। তিনি বলেন, প্রশাসন এখানে কোনো কাজই করছে না। পাথর সংরক্ষণে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা করা হচ্ছে না।
প্রসঙ্গত, পুরো এলাকার জীবিকাই লুটের পাথরকেন্দ্রিক। ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর, জাফলং, আরেফিন টিলা আর রাংপানি থেকে ১ বছরে লুট হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ঘনফুট পাথর।