এক কনস্টেবল গ্রেপ্তার
আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৫ ১০:৪৭ এএম
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৫ ১০:৪৮ এএম
প্রতীকী ছবি
চট্টগ্রামে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় এক রাতেই ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে এই ঘটনার পর অস্ত্র বের করতে দেখলেই গুলির নির্দেশ দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন মহানগর পুলিশের কমিশনার। ওয়ারলেসে দেওয়া তার সেই বার্তা ফাঁসের অভিযোগে একজন পুলিশ সদস্যকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর এতসব কাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে একটি ছাগলের হাটকে কেন্দ্র করে।
সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা মতিউর রহমানের ছাগল কাণ্ডের পর আরেকটি ছাগল কাণ্ডে যেন তোলপাড় চলছে চট্টগ্রামজুড়ে। যার ঢেউ আছড়ে পড়ছে রাজনীতিতেও। ১১ আগস্ট রাত ১০টার দিকে সল্টগোলা ক্রসিং ইশান মিস্ত্রি হাট সংলগ্ন সড়কে একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে এই হামলার ঘটনা ঘটে। জয় বাংলা স্লোগানে দেওয়া এই মিছিলের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া শাকিলকে ধরে পুলিশের একটি টিম। সেই সময় কোমরে থাকা ছুরি দিয়ে পুলিশের উপপরিদর্শক আবু সাঈদ রানাকে আহত করে পালিয়ে যায় শাকিল।
জানা গেছে, ছাগলের একটি হাটের আধিপত্যকে কেন্দ্র করে সেদিন এই মিছিল করে শাকিল। আর এই ঘটনার জের ধরে একের পর এক নতুন নতুন ঘটনা ঘটে। যার সর্বশেষ ফলাফল হলো গুলি করার নির্দেশ দেওয়ার একটি বার্তা ফাঁস করার অভিযোগে অমি দাশ নামে এক কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করা।
হামলার বিষয়ে শাকিলের নেতৃত্বের কথা বললেও দুই মামলাতেই প্রধান আসামি করা হয়েছে বন্দর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি আব্দুল আজিমকে। ছাগলের হাটের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সেদিনের ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে উল্লেখ করে স্থানীয় একজন বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে সেদিনে ঘটনাটা একেবারে অরাজনৈতিক ছিল। যার কথা বলা হচ্ছে সেই শাকিল আওয়ামী লীগের কোনো পদে নেই। এলাকায় কিশোর গ্যাং দিয়ে চুরি, ছিনতাই করাই তার কাজ। মূলত এখানে ইসহাক সওদাগরের বাড়ির জুয়েল একটা ছাগলের হাট বসায়। সেই হাটের আধিপত্য নিয়েই শাকিল অতর্কিত সেখানে মিছিল করে হাটের মাঝখান দিয়ে খালপাড়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর অভিযান চালিয়ে খালপাড় থেকে তাকে ধরে পুলিশ। এর মধ্যেই কোমরে থাকা ছুরি দিয়ে শাকিল এস আই আবু সাইদ রানাকে আঘাত করে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরে পুলিশ এলোপাতাড়ি গ্রেপ্তার চালিয়েছে অভিযোগ করে ফয়সাল নামে একজন বলেন, সেই রাতে আমার চাচাসহ ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রত্যেককে তাদের ঘর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের ওপর হামলা করা কেউ নিশ্চয়ই ঘরে বসে ঘুমাবে না? শাকিলের ওপর এলাকার সবাই বিরক্ত। কিন্তু সেটাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকার মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে।’
তবে পুলিশের মামলায় ছাগলের হাটের বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই। এই বিষয়ে জানতে সন্ত্রাস দমন আইনে করা মামলার বাদী উপ পরিদর্শক এরশাদ মিয়াকে কল করলে ছাগলের হাটের বিষয় তুলতেই তিনি কল কেটে দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. ইয়াসিন মিয়া বলেন, ‘তদন্তের বিষয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।’ তবে যে এসআই আহত হয়েছে তাকে খুব গুরুতর আঘাত করা হয়েছে। একটু এদিক-ওদিক হলে সে মারা যেতে পারত।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে বন্দর থানার ওসি আফতাব উদ্দিন বলেন, ‘ওরা জয় বাংলা বলে মিছিল দিয়েছিল। তারা চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী।’ মুখে শাকিলকে প্রধান আসামি বললেও দুই মামলায় আজিমকে প্রধান আসামি করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু আজিম গ্রেপ্তার হয়েছে সেজন্য এজাহারে আজিমের নাম প্রথমে এসেছে। তবে মামলায় লেখা আছে শাকিলের নেতৃত্বে মিছিল ও হামলা হয়েছে।’ প্রকৃতপক্ষে দুই মামলার কোথাও শাকিলের নেতৃত্বে হামলার বিষয়টি উল্লেখ নেই।
এর মধ্যে পুলিশের সামনে অস্ত্র বের করলেই সরাসরি গুলির নির্দেশ দিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজ। এক ওয়ারলেস বার্তায় তিনি বলেন, শুধুমাত্র রাবার বুলেট দিয়ে কাজ হচ্ছে না। বন্দরে (বন্দর থানা) একজন এসআই গুরুতর আহত হয়েছেন। আরেক দিন আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটবে। বন্দর থানার অফিসার যে অবস্থায় পড়েছেন, ওই পরিস্থিতিতে পড়লে যেন লাশ ছাড়া মোবাইল পার্টি, পেট্রোল পার্টি ফেরত না আসে। পুলিশের কোনো টহল পার্টির সামনে অস্ত্র বের করলে, আই রিপিট, সেটা ধারালো অস্ত্র হতে পারে কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র হতে পারে অস্ত্র বের করা মাত্র গুলি হবে, এতে কোনো সন্দেহ নাই, সবাইকে বলছি। আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার, দণ্ডবিধি ৯৬ থেকে ১০৬ পর্যন্ত, আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার সকল পুলিশ অফিসারের আছে। অস্ত্র কিংবা কোপ দেওয়ার আগে অস্ত্র বের করামাত্র গুলি হবে। সরকারি গুলির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
কমিশনারের এই বার্তাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এই ঘটনায় কনস্টেবল অমি দাশকে দায়ী করে একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে সোমবার।