রূপগঞ্জ
সাইফুল ইসলাম, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৫ ০৯:০০ এএম
ছবি : প্রবা
রূপগঞ্জে গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি, স্কুল-মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ৪০ গ্রামের লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। ৫ শতাধিক মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া পুকুরের মাছ ভেসে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষিরা। উপজেলার দুটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, তারাব পৌর এলাকার মাসাব, বরপা বাগানবাড়ি, সুতালড়া, আড়িয়াব, তেতলাব, কর্ণগোপ, মৈকুলী, ভায়েলা, পাঁচাইখা, মোগড়াকুল, পবনকুল, বরাব, খাদুন, যাত্রামুড়া, গোলাকান্দাইল, বিজয়নগর, বলাইখা, উত্তরপাড়া, মিয়াবাড়ি, নামাপাড়া, দক্ষিণপাড়া, নাগেরবাগ, ৫ নম্বর ক্যানেল, রূপসী, হাটাবো টেকপাড়া, কালাদি, নলপাথর, নরাবো, কোশাব, আইতলা, ডুলুরদিয়া, গন্ধর্বপুরসহ বেশ কয়েকটি নিচু এলাকায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে মানুষ।
১৯৮৪ সালে ৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে ২ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি নিয়ে নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী অগ্রণী সেচ প্রকল্প-১ এবং ১৯৯৩ সালে শতকোটি টাকা ব্যয়ে শীতলক্ষ্যার পূর্বপাড়ে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমি ঘিরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই এ প্রকল্পের ভেতরে শুরু হয় জলাবদ্ধতা। জনবসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে দুর্ভোগ। টানা বৃষ্টিতে দুটি সেচ প্রকল্প এলাকার কোথাও জমেছে হাঁটুপানি, কোথাওবা কোমরপানি।
স্থানীয়রা বলেন, অপরিকল্পিতভাবে মিল-কারখানা গড়ে উঠেছে অগ্রণী সেচ প্রকল্প এলাকায়। বর্তমানে সেচ প্রকল্প দুটির কৃষিজমিতে সেচের তেমন ব্যবস্থা নেই। এসব জমিতে ঘরবাড়ি ও শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। এখন প্রকল্প দুটিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দ্রুত করা দরকার।
কাঞ্চন পৌর এলাকার হাটাবো টেকপাড়া, কালাদি, নলপাথর, নরাবো, কোশাব, আইতলা, ডুলুরদিয়া গ্রামের বাসিন্দারা জানান, এখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বাস। এসব গ্রামের কৃষিজমিতে পানি নিষ্কাশনের জন্য ছোটবড় মিলিয়ে ২০টি খাল রয়েছে। এসব খাল দিয়ে বৃষ্টির পানি সরে যেত। বেশ কয়েক বছর ধরে খালগুলো ভরাট করেছে একটি আবাসন কোম্পানি। একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। কয়েকদিনের টানা বর্ষণে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ওসব এলাকায় বেশ কয়েকটি পাকা রাস্তা ডুবে গেছে। ময়লা-আবর্জনাযুক্ত এসব পানিতে শিশু, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে নারী-পুরুষরা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। গত কয়েকদিনে অর্ধশতাধিক মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে।
গোলাকান্দাইল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন জানান, তার ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি মানুষের বসবাস ৫ নম্বর ক্যানেল ও নতুন বাজার এলাকায়। এখানে বিভিন্ন শিল্প-কারখানার কয়েক হাজার শ্রমিক-কর্মচারীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ বাস করে। জলাবদ্ধতা ঠেকাতে তারা খালগুলো পরিষ্কার করছেন। পরিষ্কার না করলে জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নেবে।
রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আইভি ফেরদৌস বলেন, ইদানীং চর্ম ও পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ইতোমধ্যে ৫ শতাধিক রোগীকে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ ২-এর জিএম প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ বলেন, দুদিন আগে ভূলতা গ্রিড উপকেন্দ্রে সকালে একবার এবং দুপুরে একবার ফ্লাশিং হওয়ায় জিটি-১ এবং জিটি-২ দুটি ট্রান্সফরমার বন্ধ হয়ে যায়। ট্রান্সফরমার দুটি চালু করতে সময় লেগেছে। ফলে রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও মাধবদী এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। বর্তমানে অবস্থা স্বাভাবিক।
উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী আক্তার হোসেন বলেন, খাল-বিল ভরাট হওয়া, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ও অচল পাম্প মেশিনÑ এই তিন কারণে মূলত জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা নতুন প্রকল্প নিয়েছি। আশা করি, দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম বলেন, গত ১১ মাসে ৮টি খাল পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি খাল পুনঃখনন করেছি। বাকিগুলো দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক রাকিবুল আলম রাজিব বলেন, আমরা চেষ্টা করছি দখলী খালগুলো উদ্ধার করতে। যাতে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা যায়।