রামু (কক্সবাজার) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১২:০০ পিএম
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে গরুকাণ্ডে জড়িত রাঘববোয়ালরা আছেন রাজনীতিতে, শীর্ষ ব্যবসায়ীদের মাঝে এবং প্রশাসনেও। তবে দৃশ্যপটে দেখা মিলছে শুধু চোরাকারবারিদের। দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা শাহিন ডাকাত যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে এসেছে থলের বিড়াল। একে একে ধরা পড়ছে শাহীনের বিভিন্ন শাখা-উপশাখার কমান্ডাররা। তাদের থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-গোলাবারুদ। এ ছাড়াও জব্দ করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক মিয়ানমারের অবৈধ গরু।
নতুন করে সীমান্ত চোরাচালান শুরুর লক্ষ্যে ইতোমধ্যে গঠন করা হয়েছে শাহিনের ডান হাতখ্যাত নিরুপম শর্মা নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে বিশাল সিন্ডিকেট। জেলে বসেই চক্রটিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন শাহিন ডাকাত। আর শাহিনের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছিলেন নুরুল আবছার ওরফে ডাকাত আবছার। তাকেও অস্ত্র-গোলাবারুদসহ গ্রেপ্তার করেছে বিজিবি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চোরাচালানের জন্য সবচেয়ে বেশি আলোচিত রামুর গর্জনিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকা। স্থানীয় রাজনীতিক ও প্রশাসনের লোকজন ছাড়াও দেশের কয়েকটি শীর্ষ মাফিয়া গ্রুপ ডাকাত শাহীনের সেল্টারদাতা হিসেবে কাজ করছিল। চলতি বছরের ৫ জুন সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে শাহীন ডাকাতকে অস্ত্রসহ এবং একই সঙ্গে ৩১টি গরু ও একটি ছাগল জব্দ করা হয়। বড় চক্রটির সিন্ডিকেট প্রধান ধরা খাওয়ার পর তার সহযোগীরাও ধরা পড়ছে। এতে প্রশাসনের ওপর বেশ ক্ষিপ্ত চোরাকারবারিরা।
তারই অংশ হিসেবে যৌথ অভিযানে জব্দ করা ৩১টি চোরাই পথে আসা মিয়ানমারের গরুকে নিজের দাবি করে অতি গোপনে গত ১০ জুলাই বিজিবির ৬ সদস্য এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহিনকে আটকের প্রধান তথ্যদাতার বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলার আবেদন করেন ডাকাত শাহিনের ক্যাশিয়ার, একাধিক মামলার আসামি নুরুল আবছার ডাকাত। মামলার আবেদনে চোরাকারবারি নুরুল আবছার ৩১টি গরু তার খামারের বলে দাবি করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, যৌথ বাহিনী গেল ৫ জুন শাহিন ডাকাতকে গ্রেপ্তারের পর তার আস্তানা ও নিকটবর্তী পৃথক কয়েকটি স্থানে থাকা বার্মিজ গরু-ছাগল জব্দ করে, যা পরবর্তীতে ডাম্পার ট্রাকে করে নিয়ে আসা হয়। সেখানে নিলাম করা অর্থ জমা হয় সরকারের কোষাগরে। যার নথি প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। অভিযানস্থল গর্জনিয়ার মাঝিরকাটা হলেও আবছার ডাকাতের বাড়ি বোমাংখিল এলাকায়।
মামলার আবেদনে উল্লেখ্য দুই সাক্ষীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এই প্রতিবেদক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, জেলে থাকা শাহিন ডাকাত নিরুপম শর্মা ও তার অন্যতম হাতিয়ার আবছার ডাকাতকে ব্যবহার করে মামলাটির আবেদন করেছেন। তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে। এ সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। শাহিনকে গ্রেপ্তারের দিনই এসব গরু জব্দ করে বলেও জানান তারা।
অভিযোগ আছে, শাহিন ডাকাত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের কতিপয় সুবিধাভোগী ব্যক্তিবর্গ তাকে শেল্টার দিতেন। তার মাধ্যমে চোরাচালান ব্যবসা করতেন আওয়ামী লীগের নেতারা। যার কমিশনের বড় অংশ পেতেন সাবেক সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলও। পুলিশকে বুঝিয়ে দিতেন তাদের পাওনা।
প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তিনি সখ্য গড়ে তুলেছিলেন বিএনপি ও অন্যদের সঙ্গে। তবে এড়াতে পারেননি গ্রেপ্তার। গ্রেপ্তারের পর জেলে গেছেন। সেখানে বসেই গড়ে তুলেছেন নতুন সিন্ডিকেট।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে আবারও মিয়ানমার সীমান্তে সক্রিয়া তালিকাভুক্ত ২২ চোরাকারবারি। আসছে গবাদি পশুও। যাদের মধ্যে শাহিনের পর সবচেয়ে আলোচিত আবছার ডাকাত। নতুন করে এসব চোরাকারবারিকে সক্রিয় করতে সংগঠিত করছেন শাহিন ডাকাত।
দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে কাজ করেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমাদাদুল হক। তার মতে, চোরাচালান বন্ধ হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেই বিতর্কে ফেলে অসাধু চক্র। তাদের এই অপতৎপরতার ফাঁদে বাধাগ্রস্ত হয়ে অনেক কর্মকর্তাই চোরাচালানবিরোধী অভিযানে নিরুৎসাহিত হয়ে যান।
সূত্র থেকে জানা গেছে, শাহীন ডাকাতের জামিনের জন্য বড় অঙ্কের টাকা বাজেট হিসেবে পরিকল্পনা করেছে তার সাপোর্টিং টিম। জামিনের পরিকল্পনা অল্প সময়ের মধ্যে কার্যকর করা সম্ভবপর হবে না জেনেও তারা নীরবে পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্মকাণ্ড চলমান রেখেছেন।
শাহীন ডাকাতের চোরাচালানসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সিন্ডিকেটটি ৫ জুনের যৌথ অভিযান সম্পর্কিত মিথ্যা সংবাদ প্রচার করছে; যার ব্যাপারে অভিযুক্তদের জানানো হচ্ছে না এবং সবার অগোচরে হয়রানি এবং অপপ্রচারমূলক মামলা দায়েরের নিমিত্তে অর্থের বিনিময়ে গোপনে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রয়োজনীয় পেপার কাটিং তৈরি করে রাখছে। এই নথিগুলো শাহীন ডাকাতের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোকে দুর্বল করতে এবং মামলার ফোকাসিং ভিন্ন খাতে নিতে সাহায্য করবে। যেমনÑ শাহীনের মানবিক কর্মকাণ্ড, ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পুরস্কার বিতরণ কার্যক্রম, মসজিদ-মাদ্রাসায় সার্টিফিকেট বিতরণ প্রোগ্রামে তার নাটকীয় উপস্থিতি দেখানোর চেষ্টা অব্যাহত আছে।
গর্জনিয়া এবং নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকার সন্ত্রাস, চোরাচালান কার্যক্রমে জড়িত আগের সুবিধাভোগী সিন্ডিকেট গোপনে সীমান্ত এলাকা অস্থিতিশীল রেখে শতকোটি টাকার চোরাচালান ব্যবসা এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য তৎপর হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিবির রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ এ প্রতিবেদককে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিজিবির তৎপরতায় সীমান্ত চোরাচালান বন্ধ থাকলেও আবারও চক্রটি সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। চক্রটির প্রধান ডাকাত শাহীন যৌথ বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ ছিল। তার একাধিক সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে সেক্টর কমান্ডার বলেন, জেলে বসেই হয়তো চক্রটিকে সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন শাহীন ডাকাত। বাইরে আবার তার বিচ্ছিন্ন কিছু গোষ্ঠী বিজিবির বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে। আমরা তাদেরও শনাক্ত করেছি।