ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১১:৫২ এএম
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৮ নম্বর কালিঘাট ইউনিয়নের ভুরভুরিয়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৮ নম্বর কালিঘাট ইউনিয়নের ভুরভুরিয়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র যেন বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার বেহাল অবস্থার প্রতিচ্ছবি। জাতীয়করণের এক যুগ পার হলেও এখনও নেই কোনো পাকা ভবন, নেই পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, নেই শিক্ষার্থীদের জন্য শৌচাগার কিংবা খেলার মাঠ। টিনের তৈরি ঘরটির দরজা-জানালা অনেকটা ভঙ্গুর। টিনের বেড়া জরাজীর্ণ, খুলে পড়ার অবস্থায় চালের টিন। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হলেই পানিতে সয়লাব হয়ে যায় শ্রেণিকক্ষ। বিদ্যালয়টি চা বাগান ও জঙ্গলের পাশে হওয়ায় অনেক সময় সাপসহ বন্যপ্রাণীরা ঢুকে যায় শ্রেণিকক্ষে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১০ সালের প্রথম দিকে দ্য কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানির (ফিনলে) তত্ত্বাবধানে ৩৩ শতাংশ ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ ১১ বছরেও সেখানে নির্মিত হয়নি কোনো ভবন। তবে ২০২৪ সালের শেষ দিকে পাইলিংসহ পাঁচ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের জন্য চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪) থেকে অর্থ বরাদ্দ হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দরপত্র আহ্বান ও কাজ সম্পাদন করা সম্ভবপর না হওয়ায় অর্থ পুনরায় ফেরত চলে গেছে। বর্তমানে টিনসেডের জরাজীর্ণ একটি ঘরে চলছে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১৫৬ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান। মাত্র চারটি ছোট কক্ষে ভাগ করে চলছে শ্রেণিকক্ষ, যেখানে তিনটি কক্ষে ক্লাস ও একটি কক্ষে অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
সম্প্রতি সরজমিনে বিদ্যালয়ে গেলে শিক্ষার্থীরা জানায়, বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ে, টিনের চাল থেকে পানি পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়। শীতকালে ঠান্ডা ও গরমকালে প্রচণ্ড গরমে দুর্ভোগ পোহাতে হয় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের। শিক্ষার্থীদের নেই কোনো শৌচাগার। একমাত্র একটি জরাজীর্ণ শৌচাগার ব্যবহার করেন পাঁচজন শিক্ষক, যা অধিকাংশ সময়েই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বিদ্যালয়টি চা বাগান ও জঙ্গলের পাশে অবস্থিত হওয়ায় মাঝে মাঝে শ্রেণিকক্ষে সাপ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী ঢুকে পড়ে। বাউন্ডারি না থাকায় বিদ্যালয় চত্বর গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগির বিচরণস্থলে পরিণত হয়েছে।
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রীতি রবি দাস জানায়, আমার স্কুলে বৃষ্টির দিনে পানি জমে যায়, বসতে কষ্ট হয়। চতুর্থ শ্রেণির কৃষাণ রবি দাস ও সুরঞ্জিত মৃধা বলেন, আমাদের রুমে বসতে কষ্ট হয়, মাটিতে বসে লেখতে পারি না, পড়তে পারি না। আমাদের একটি ওয়াশরুম নেই। টিনের ঘরে অনেক গরম লাগে, বৃষ্টি পড়লে ক্লাসে পানি ওঠে যায়। বৃষ্টির দিনে জোঁক, সাপ ক্লাসে ঢুকে যায়। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী শিয়া রানী খাটুয়াল বলে, ‘ব্রেঞ্চ নাই, টিনের ঘরে অনেক গরম লাগে। আবার ঠান্ডার দিনে ঠান্ডা লাগে।’
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা শান্তনা পাশী বলেন, ছোট টিনসেডের ঘর, ছাত্রছাত্রী অনেক বেশি। তিনটি শ্রেণিকক্ষ আছে কিন্তু বসার অনেক কষ্ট। ব্রেঞ্চ ২০ জোড়া আছে তাতে অর্ধেক শিক্ষার্থীও বসতে পারে না। বৃষ্টি-তুফান আসলে ঘরের মধ্যে পানি ঢুকে যায়। বাচ্চাদের জন্য কোনো ওয়াশরুম নাই, শিক্ষকদের জন্য স্কুল ঘরের বাইরে একটি ছোটখাট ওয়াশরুম আছে। সেটিতেও বৃষ্টির সময় সাপ, ব্যাঙ থাকে। তাই ওয়াশরুম যেতে পারি না। সহকারী শিক্ষিকা ফাইরুজ তাবাস্সুম বলেন, বিদ্যালয় ঘরটি অনেক ছোট হওয়া কারণে হোয়াইট বোর্ড রাখারও জায়গা হয় না। প্রজেক্টর থাকা সত্ত্বেও এটি আমরা ব্যবহার করতে পারছি না।
প্রধান শিক্ষক সবিতা রানী দেব বলেন, ১৫ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। অনেকবার আবেদন করেছি, কিন্তু এখনও কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পিইডিপি-৪ প্রকল্প থেকে পাঁচতলা ভবনের জন্য একটি বরাদ্দ এলেও সময়মতো টেন্ডার আহ্বান ও কাজ শুরু না হওয়ায় বরাদ্দ ফেরত চলে যায়।
সিংহবীজ ক্লাষ্টারের সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও বিদ্যালয়টির অ্যাডহক কমিটির সভাপতি জ্যোতিষ রঞ্জন দাশ বলেন, আমাদের উপজেলার তিনটি স্কুলে এখনও ভবন নির্মাণ হয়নি। এরমধ্যে ভুরভুরিয়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সবচেয়ে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর একাধিকবার পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। প্রকৌশল বিভাগ থেকে ভবন নির্মাণের বিষয়টি আশ্বস্ত করা হলেও এখনও কোনো খোঁজখবর নেই।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের উপজেলায় ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৩৫টিতে পাকা ভবন রয়েছে। বাকি তিনটির মধ্যে সবচেয়ে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে ভুরভুরিয়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। বরাদ্দ প্রাপ্তি সাপেক্ষে ভবন নির্মাণ করা হবে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইউসুফ হোসেন খান জানান, সময়সীমার ঘাটতির কারণে পিইডিপি-৪ এর বরাদ্দকৃত ভবনের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। আগামী পিইডিপি-৫ প্রকল্পের অধীনে ভবন নির্মাণের নতুন বরাদ্দের প্রত্যাশা রয়েছে।