শাকিল মাহমুদ, বরিশাল
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৫ ১৩:৪২ পিএম
ফাইল ফটো
আধুনিক বিশ্বে শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুতগতিতে বাড়ছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম শুধু শিক্ষাকে আরও সহজ, আকর্ষণীয় ও অংশগ্রহণমূলক করে তোলে না, বরং শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ এবং বোঝার ক্ষমতাও বাড়িয়ে তোলে। তবে দুঃখজনকভাবে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল বিভাগে এই আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি এখনও সঠিকভাবে কার্যকর হয়নি। ইন্টারনেট সংযোগের অভাব, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণের ত্রুটি এবং তদারকির অভাবে বহু স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর বিকল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠে আগ্রহ হারাচ্ছে এবং বরিশাল আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়ছে।
বরিশাল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অফিস জানিয়েছে, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে বিভিন্ন ধরনের ভিজ্যুয়াল, অডিও এবং ইন্টারেক্টিভ উপাদান ব্যবহার করে পাঠদান করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা আরও মনোযোগ সহকারে শিখতে পারে এবং শেখার প্রক্রিয়াটি আরও আনন্দদায়ক হয়। বিষয়টি মাথায় রেখে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের জন্য ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত। ২০১৮ সাল থেকে এই পদ্ধতি শুরু হলেও এখন বরিশালের অধিকাংশ বিদ্যালয় মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে ক্লাস হচ্ছে না।
বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় ১৫৮৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ২০১৮ সালে জেলার অধিকাংশ স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের জন্য ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর বিতরণ করা হয়েছে।
বিভিন্ন বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর নষ্ট হলেও তা মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই। শিক্ষকরা বাধ্য হয়ে শুধু পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমেই পাঠদান করছেন। ফলে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে পাঠদানের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। অধিকাংশ স্কুলে নেই ইন্টারনেট সংযোগ, এমনকি রাউটার থাকলেও তাতে ইন্টারনেট চালু করা হয়নি। ফলে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়ছে বরিশাল।
এদিকে দ্বিতীয় ধাপে পিইডিপি-৪ প্রকল্পের আওতায় বরিশালের ১০টি উপজেলায় দ্বিতীয় দফায় আরও ৬৫৭টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের জন্য প্রজেক্টর বিতরণ করা হবে। এর মধ্যে বরিশাল সদর উপজেলায় ১২৩, বাবুগঞ্জে ৩৫, মুলাদিতে ৬৭, হিজলায় ৫০, গৌরনদীতে ৪০, আগৈলঝাড়ায় ৪৭, মেহেন্দীগঞ্জে ৯৪, বানারীপাড়ায় ৪৫, উজিরপুরে ৭৫ ও বাকেরগঞ্জে ৯৯টি স্কুলে প্রজেক্টর দেওয়া হবে। তবে প্রথম ধাপের যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় নতুন করে দেওয়া প্রজেক্টরগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আগৈলঝাড়া উপজেলার উত্তর শিহিপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফরোজা আক্তার বলেন, ‘২০১৮ সালে আমাদের স্কুলে মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম আসে, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে। ইন্টারনেট সংযোগও নেই। ফলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ব্যবহারে আমরা পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছি। বর্তমানে দুটি মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর একটি ল্যাপটপ বিকল অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
মুলাদী উপজেলার হালিমাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমান বলেন, পাঁচ বছর আগে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের জন্য পাওয়া ১টি প্রজেক্টরসহ চলতি বছরে পাওয়া আরও একটি প্রজেক্টর নষ্ট হয়ে আছে। রাউটার পেলেও নেই ইন্টারনেট সংযোগ।
বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আল এমরান জানান, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বৃদ্ধিতে অত্যন্ত কার্যকর। বিষয়টি মাথায় রেখে দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর বিতরণ করা হচ্ছে। প্রথম ধাপ ও দ্বিতীয় ধাপে বরিশালের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে ইতোমধ্যেই সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশই স্কুলেই মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও ল্যাপটপ নষ্ট হওয়ার বিষয়টি আমরা জেনেছি এবং তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের মতে, সরকারিভাবে সরঞ্জাম বিতরণ করে আধুনিক শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করা হলেও বরিশালের মাঠ পর্যায়ে তার বাস্তবায়নে ঘাটতি স্পষ্ট। যন্ত্রপাতির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত না করলে বরিশালের শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়ে পড়বে। সময় এসেছে পরিকল্পনার পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়নে নজর দেওয়ার।