খুলনা
খুলনা অফিস
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৫ ২২:৩৭ পিএম
রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত চিংড়ি রপ্তানিতে বাংলাদেশ বড় ধাক্কা খেয়ে আসছে গত কয়েক বছর ধরে। উৎপাদন ও রপ্তানিতে ধস বিদেশের বাজারে চিংড়ি খাতকে সংকটে ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিকে ভেনামি চিংড়ি চাষে নতুন স্বপ্ন বুনছে খুলনার চাষিরা।
আকারে বাগদার চেয়ে ছোট হলেও উৎপাদনে বহুগুণ বেশি ভেনামি বর্তমানে বিশ্ববাজারের প্রায় ৮২ শতাংশ দখল করে রেখেছে। ২০২১ সালে খুলনার পাইকগাছায় পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই চাষ এখন বাণিজ্যিক রূপ নিতে শুরু করেছে।
ভেনামি চাষে খুলনায় পথ দেখিয়েছেন যশোরের মৎস্য প্রক্রিয়াজাত কারখানার উদ্যোক্তা শ্যামল দাস। তিনি প্রথমে মাত্র ৬টি পুকুরে চাষ শুরু করলেও ধারাবাহিক সাফল্যের পর বর্তমানে খুলনার বটিয়াঘাটার চকশৈলমারিতে ২০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে চাষ করছেন। এর মধ্যে তিনটি পুকুর থেকে ইতোমধ্যে প্রতি হেক্টরে ১০ হাজার কেজি করে চিংড়ি আহরণ করেছেন।
তিনি জানান, প্রথমে ভয় ছিল, নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতি কাজ করবে কি না। কিন্তু সময়মতো পোনা, খাবার ও প্রোবায়োটিক নিশ্চিত করায় উৎপাদন হয়েছে আশাতীত।
বর্তমানে খুলনায় ২৫ হেক্টর জমিতে ১২ জন চাষি ভেনামি চাষ করছেন। আর ১৮৫ জন চাষি আধা নিবিড় পদ্ধতিতে বাগদা চাষ করছেন। বটিয়াঘাটা, দাকোপ, কয়রা, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়া উপজেলায় এই চাষ বিস্তার লাভ করছে।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, প্রচলিত বাগদা চাষে হেক্টরপ্রতি ৪ থেকে ৫০০ কেজি উৎপাদন হয়, আধা নিবিড় পদ্ধতিতে তা বেড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার কেজি হয়। অথচ ভেনামি চাষে উৎপাদন হয় ১০ হাজার কেজিরও বেশি। তার মতে, স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও বিদেশে রপ্তানি করার মতো উৎপাদন সম্ভব হবে।
ভেনামি চাষে সার্বক্ষণিক তদারকি করা প্রসেনজিত রায় বলেন, ১০২ দিনে প্রতিটি চিংড়ির গড় ওজন হয়েছে ২৪ গ্রাম। ১০ লাখ পোনা ছাড়ার পর ৮৫ শতাংশ বেঁচে গেছে। কিন্তু এর পুরো প্রক্রিয়াই বৈজ্ঞানিক। বাইরে থেকে কোনো দূষণ যাতে না আসে, সেজন্য বায়োসিকিউরিটি মানা বাধ্যতামূলক।
তবে উৎপাদন বাড়লেও রপ্তানিপ্রবণতা এখনও উল্টোপথে। মৎস্য অধিদপ্তরের মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে খুলনা অঞ্চল থেকে ২৪ হাজার ১০৪ টন হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১৫ হাজার ৪৫১ টনে।
কর্মকর্তারা বলেন, স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পরই রপ্তানি করা হয়। ভেনামি এখনও সাধারণ ক্রেতার কাছে পরিচিত না হওয়ায় অনেক সময় তা ‘চাকা’ নামে বাজারে বিক্রি হয়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে ভেনামি চাষের মূল পথপ্রদর্শক দীপন বিশ্বাস মনে করেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এই চাষের জন্য বিশ্বের সেরা অঞ্চলগুলোর একটি। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, উত্তরের ঢলের মিষ্টি পানি এবং সাগরের লবণ পানির মিশ্রণে যে ব্রাকিশ ওয়াটার তৈরি হয়, তা ভেনামি চাষের জন্য আদর্শ পরিবেশ দেয়।
চাষিরা বলেন, সরকারের সহায়তা, মানসম্মত পোনা সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণ নিশ্চিত হলে ভেনামি চাষের প্রসার দ্রুত ঘটবে। বাগদা চাষে যেমন খরচ বেশি আর উৎপাদন কম, ভেনামিতে তেমন সমস্যা নেই। তবে শুরুতে খরচ একটু বেশি লাগে কিন্তু উৎপাদন তিনগুণ হলে লাভও তিনগুণ।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ইতোমধ্যেই ভেনামি চাষের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, রোগ নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজার সম্প্রসারণ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
এ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভেনামি চাষ বাগদা চাষকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করবে না। বরং দুই ধরনের চিংড়িই পাশাপাশি বাজারে থাকবে। দেশের জিআই পণ্য বাগদার আন্তর্জাতিক পরিচিতি রয়েছে, যা ধরে রাখতে হবে।
বিশ্বের প্রধান ভেনামি চিংড়ি উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চীন ৩৮ শতাংশ, ভারত ১৫ শতাংশ, ভিয়েতনাম ১৪ শতাংশ, ইকুয়েডর ১৩ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ১১ শতাংশ ও অন্যান্য দেশ ৯ শতাংশ উৎপাদন করে থাকে। বর্তমানে বিশ্বে ভেনামি চিংড়ি উৎপাদনের ৮২ শতাংশ বাজার দখলে রেখেছে এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশ। বাংলাদেশে বাণিজ্যিক উৎপাদন মাত্র ১ শতাংশ হলেও বৃদ্ধির সম্ভাবনা অনেক।
চিংড়ি শিল্পে মন্দা কাটিয়ে ওঠার জন্য ভেনামি চাষ এখন এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে। খুলনা অঞ্চলের চাষিদের সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হলে বাংলাদেশের চিংড়ি আবারও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় খাত হয়ে উঠতে পারে।