আজিজুল হক, ফরিদপুর
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৫ ১৯:৫৮ পিএম
আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৫ ২০:১৩ পিএম
হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে মধুমতী নদীর তীব্র ভাঙন। ইতোমধ্যেই নদী ভাঙনের শিকার হয়ে বাড়িঘর, ফসলি জমি হারিয়ে অনেকেই একেবারে নিঃস্ব হয়েছেন। ভাঙনের তীব্রতা বেশি থাকায় রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে নদীপাড়ের হাজারো পরিবারের।
গত কয়েকদিনের মধুমতী নদীর ভাঙনে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের শিকারপুর, টিটা পানাইর, কুমুরতিয়া, ইকড়াইল ও টিটা গ্রামের প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার তাদের বাড়িঘর হারিয়েছেন। নদীঙনের শঙ্কায় রয়েছেন আরো প্রায় সাড়ে তিনশ’ পরিবার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,
টগরবন্দ ইউনিয়নে গত কয়েকদিন ধরে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। নদীতে পানি বাড়তে থাকায় ভাঙনের
তীব্রতাও বেড়েছে। শিকারপুর গ্রামের নিজামউদ্দিন, হরেকৃষ্ণ মন্ডল, আইয়ুব মোল্লা বলেন,
যেভাবে নদীভাঙন শুরু হয়েছে তাতে করে বসতবাড়িতে থাকাই এখন ভীতিকর অবস্থা। নিজামউদ্দিন
হারিয়েছেন ভিটেমাটি ও দুই একর ফসলি জমি। আর ৩৮ শতাংশ জমি এবং চারটি ঘর হারিয়েছেন হরেকৃষ্ণ
মন্ডল। সবকিছু হারিয়ে এই পরিবারগুলো এখন নদী তীরবর্তী স্থানে অন্যের জায়গায় ছাপড়া ঘর
তৈরি করে বৃষ্টির মধ্যে নিদারুণ কষ্টে বসবাস করছেন।
ইউনিয়নটির শিকারপুর,
টিটা পানাইল, কুমুরতিয়া, ইকড়াইল ও টিটা গ্রামের কয়েকশ’ পরিবারে এখন রাতের গুম হারাম
হয়ে গেছে। তাদের সবার চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ, ‘এ বছর যেভাবে নদী ভাঙছে তাতে করে
পরিবার নিয়ে পথে বসার জোগাড় হয়েছে।
স্থানীয় এলাকাবাসীর
অভিযোগ, মধুমতীর ভাঙন ঠেকাতে সরকারের তেমন কোনো তৎপরতা নেই। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে
তারা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মহাপরিচালকের কাছে গত ২৬ মে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু
সেই আবেদনের কোনো সৎ উত্তর তারা পাননি।
ইকড়াই গ্রামের বাসিন্দা
মনিরুল ইসলাম জানান, ‘এবার যেভাবে নদীভাঙন শুরু হয়েছে, তা ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা
না নেওয়া হলে অল্পসময়ের মধ্যেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ অনেক ঘরবাড়ি
বিলীন হয়ে যাবে। অর্ধশত মানুষ ইতোমধ্যে বসতঘর হারিয়েছেন। শত শত একর আবাদি জমি বিলীন
হয়ে গেছে নদীতে’। গ্রামের আরেক বাসিন্দা আবদুস সাত্তার প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আর কত বসতবাড়ি
বিলীন হলে সরকারের টনক নড়বে’ ।
ইতোমধ্যে ইকড়াইল গ্রামের
একটি মসজিদ নদীতে হারিয়ে গেছে। ইকড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন নদীর মাত্র ২০
গজ দূরে। যে কোনো মুহূর্তে সেটি তলিয়ে যেতে পারে। ভয়ে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসা
বন্ধ করে দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, পাঁচটি গ্রামের ১০টি জামে মসজিদ, একটি কলেজ, দুটি
হাইস্কুল, চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি দাখিল মাদ্রাসা, একটি কমিউনিটি ক্লিনিক,
একটি সাব-পোস্ট অফিস, দুটি বড় হাট, ১০টি মাছ ও গবাদিপশুর খামার, কয়েকটি কাঁচা সড়ক,
ঈদগাহ, কবরস্থানসহ শত শত একর ফসলি জমি, গাছপালাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়ে তারা আতঙ্কে
আছেন।
টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের
(ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান ইমাম হাচান শিপন বলেন, ‘মধুমতীতে পানি বাড়ার সাথে সাথে ভাঙনও
বেড়েছে। এখনই যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে এই অবহেলিত এলাকাটি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।
বর্তমান চেয়ারম্যান
মিয়া আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, ভাঙনের বিষয় জানিয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে পাউবো মহাপরিচালকের
কাছে আবেদন করা হয়েছে। সেখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে। বিষয়টি তারা
উপজেলা প্রশাসনকেও জানিয়েছেন।
এদিকে, ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো
গত বুধবার দুপুরে পরিদর্শনে যান ফরিদপুর পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) সন্তোষ
কর্মকার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল, সহকারী কমিশনার (ভূমি) একেএম
রায়হানুর রহমানসহ অন্য কর্মকর্তারা। এ সময় তারা স্থানীয়দের নদী ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা
গ্রহণের আশ্বাস দেন।
আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী
কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, কয়েকদিনের মধ্যে ভাঙন প্রতিরোধে কাজ শুরু হবে
বলে আশা করছেন। যেসব পরিবার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা
করবেন।