আরমান খান, রাঙামাটি
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৫ ১০:৫১ এএম
রাঙামাটিতে পাহাড়ঘেরা লংগদু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
দুর্গম পাহাড়ঘেরা রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় শিক্ষার আলো ছড়ানোর লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালে কিছু সচেতন মানুষের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় লংগদু উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি এ অঞ্চলের শিক্ষার অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে ভয়াবহ শিক্ষক সংকটে ভুগছে। ১৯৮৪ সালে জাতীয়করণ হলেও দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকের অভাব, প্রশাসনিক শূন্যতা এবং কার্যকর তদারকির অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে এর শিক্ষার মান। আধুনিক সুবিধা ও অবকাঠামো থাকার পরও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় আজও পিছিয়ে পড়ছে বিদ্যালয়টির শত শত শিক্ষার্থী।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ২৪২ জন, অথচ সরকারি শিক্ষক মাত্র একজন। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। পাঁচটি সহকারী শিক্ষকের পদের মধ্যে চারটি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। সঙ্গে অফিস সহকারী ও দপ্তরির পদ দুটি দীর্ঘদিন যাবত শূন্য রয়েছে। বর্তমানে কিছু অতিথি শিক্ষক দিয়ে কোনো রকম পাঠদান চলছে। শিক্ষক না থাকায় বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগে এবার কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। বিদ্যালয়টিতে একটি পরিচালনা কমিটি থাকলেও সেই কমিটির শেষ কখন সভা হয়েছেÑ তা জানা নেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের। কমিটির দায়িত্বে আছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও প্রধান শিক্ষকসহ মোট পাঁচ সদস্য।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রশিদুল ইসলাম জানান, বর্তমানে আমি একাই সরকারি শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য ২০০৮ সাল থেকে। নেই কোনো সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ। সহকারী শিক্ষকের পাঁচটি পদের চারটিই শূন্য। তবে অফিস সহকারী ও দপ্তরির পদ দুটি সম্প্রতি পূরণ হওয়ার আদেশ হলেও তারা যোগদান করেনি। গত ফেব্রুয়ারিতে গণিত শিক্ষক নিখিল কান্তি দেব এবং মার্চে ইংরেজি শিক্ষক তৌহিদুল রেজাকে বদলি করা হলেও তাদের স্থলে কাউকে পদায়ন করা হয়নি। শিক্ষকের অভাবে বিদ্যালয়ের ফলাফলেও ধস নেমেছে। এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৭১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১৪ জন। ফলে উপজেলার অন্যান্য বিদ্যালয়ের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সম্প্রতি সরেজমিন বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, একটি আধুনিক একাডেমিক ভবন নির্মাণাধীন। ছাত্রদের জন্য একটি ৫তলা বিশিষ্ট ছাত্রাবাসের নির্মাণকাজ প্রায় শেষের পথে। রয়েছে আরও দুটি একাডেমিক ভবন, আইসিটি লার্নিং সেন্টার, বিজ্ঞান ভবন, প্রধান শিক্ষকের বাসভবন, প্রশাসনিক ভবন, শিক্ষক ডরমেটরি। কিন্তু এসব অবকাঠামো বছরের পর বছর ধরে ব্যবহার না করেই পড়ে আছে।
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবিদুর রহমান জিহাদ বলেন, আইসিটি লার্নিং সেন্টারে আগে সপ্তাহে একদিন এমএস ওয়ার্ড শেখানো হতো। কিন্তু এখন কোনো শিক্ষক না থাকায় ল্যাবটি বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের অভিভাবকরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা মিজানুর রহমান বলেন, সরকারি স্কুলে ভালো পড়াশোনার আশায় মেয়েকে ভর্তি করেছি, কিন্তু নিয়মিত ক্লাসই হয় না। আগামী বছর অন্য স্কুলে ভর্তি করাতে হবে এমন অবস্থা চলতে থাকলে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, আমি যোগদান করেছি এক মাস হয়েছে। এরমধ্যে চেষ্টা করেছি উপজেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের পাশাপাশি সংকটগুলো জানার। তবে এটা খুবই দুঃখজনক যে একটি সরকারি বিদ্যালয়ে এত বড় শিক্ষক সংকট রয়েছে। অতীতে জনবল কম রেখে যে ভুল করা হয়েছে, তার ফল ভোগ করছে এখনকার শিক্ষার্থীরা। স্থানীয় শিক্ষকদের এখানে পদায়ন করলে কিছুটা সমাধান হতে পারে।
এ বিষয়ে রাঙামাটি জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সরিৎ কুমার চাকমা বলেন, শুধু লংগদু নয়, দেশে আরও অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সৃষ্টপদ নেই। মাউশি আমাদের কাছে চাহিদা চাইলে আমরা সেভাবে পর্যাপ্ত শিক্ষকের পদের জন্য তথ্য পাঠাতে পারব। এই সমস্যা দূর করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগ দরকার।