বন্যা পরিস্থিতি
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৫ ২১:৪৬ পিএম
উজানের টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে উত্তরের তিস্তা ও দক্ষিণাঞ্চলের পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ীর বহু এলাকায় দেখা দিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি ও ভাঙন। প্লাবিত হয়েছে চরাঞ্চল, তলিয়ে গেছে ফসলি জমি, পানিবন্দি রয়েছে হাজারো মানুষ।
রংপুর : উজানের পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিপাতে দু’দিন ধরে বিপদসীমার ওপর দিয়ে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহিত হয়েছে। এতে করে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার নিম্নাঞ্চল, চর ও দ্বীপ চরগুলো প্লাবিত হয়েছে। ফলে চরাঞ্চলের মৎস্য চাষিদের পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। তিস্তার নিম্নাঞ্চলে রোপা আমন ও সবজি ক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। রংপুরের তিন উপজেলায় প্রায় দেড় হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, আগামী শুক্রবার পর্যন্ত তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর থাকতে পারে। এরপর দেশের উজানে ভারী বৃষ্টিপাত কমে গেলে তিস্তা নদীর পানি ধীরে ধীরে কমে যাবে।
লালমনিরহাট : তিন দিনের টানা ভারী বৃষ্টি এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে চরাঞ্চলের রাস্তাঘাট ও আমন ধানের ক্ষেত, পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বহু পরিবার। অনেকে গবাদিপশু ও মালপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। তিস্তার পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে লালমনিরহাট সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার জানান, বন্যাকবলিত মানুষের ত্রাণসহায়তার জন্য জেলা প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে, পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
নীলফামারী : ভারতের সিকিমের পাহাড়ে ও সমতলে ভারী বর্ষণের কারণে তিস্তা নদীর পানি নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে পানি বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। টানা ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিপদসীমার ওপরে পানি প্রবাহিত হওয়ায় নীলফামারীর বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে অন্তত ৪৫টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে রোপা আমনসহ নানা ফসলের ক্ষেত।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, আগামী দুই দিন এই অঞ্চলে ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।
কুড়িগ্রাম : ফের কুড়িগ্রামের সব নদনদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বিদপসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে তিস্তার পানি। গত দুই দিন ধরে ক্রমাগত ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থায় জেলার ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে অববাহিকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
সরেজমিনে দেখা গেছে, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সঙ্গে চলছে ভাঙন। জেলার রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ও নাজিমখাঁন এলাকার শতাধিক পরিবার ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। এ অবস্থায় আতঙ্কিত বাসিন্দারা জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের দাবি জানিয়েছে।
পাউবো, কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ‘পানি বাড়ছে। বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকার জন্য কিছু সংখ্যক জিও ব্যাগ প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। তবে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই।’
কুষ্টিয়া : কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীতে পানি অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ফলে প্রতিদিন নতুন নতুন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে চরাঞ্চলের চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান। তলিয়ে গেছে গ্রামীণ সড়ক ও কয়েকশ হেক্টর ফসলি জমি। চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম পানির নিচে চলে গেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল হাই সিদ্দিকী বলেন, পদ্মার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চারটি ইউনিয়ন ক্ষতির মুখে রয়েছে। এর মধ্যে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর পুরোপুরি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।
রাজবাড়ী : উজান থেকে নেমে আসা ঢলে রাজবাড়ীতে হুহু করে বাড়ছে সব নদনদীর পানি। কোনো কোনো স্থানে পানি বিপদসীমা ছুঁইছুঁই। এতে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলগুলো। পানি বাড়ার কারণে জেলার ৫৭ কিলোমিটার নদী তীরবর্তী অংশের বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা দিয়েছে ভাঙন।
রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী এম এ শামীম বলেন, উজানের পানির চাপে রাজবাড়ীর বিভিন্ন নদনদীর পানি গত এক সপ্তাহ ধরে বাড়ছে। পানি বৃদ্ধি পেলেও এখনও বিপদসীমা অতিক্রম করেনি এবং নিম্নাঞ্চল বা নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম , দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) ও রাজবাড়ী প্রতিবেদক