ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৫ ১২:৫৩ পিএম
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হাইদচকিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষ দখল করে রাত কাটানোর অভিযোগ উঠেছে সাবেক সভাপতি চৌধুরী রাশেদুল আবেদীনের (রাশেদ চৌধুরীর) বিরুদ্ধে। তিনি এর আগে সভাপতি থাকার সুবাদে এবং সাবেক উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন চৌধুরীর ভাতিজা পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে প্রায় দুই বছর ধরে স্কুল ভবনের একটি কক্ষ ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করে আসছেন। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে এবং পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অভিভাবকরা বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে শ্রেণিকক্ষে বসে তিনি উলঙ্গ অবস্থায় এক নারীর সঙ্গে ভিডিওকলে কথা বলছেন এবং মদ পান করছেন- এমন একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ওই কক্ষে তিনি বিছানা পেতে রাত কাটান এবং দিনের বেলায় ব্যক্তিগত জিনিসপত্র রাখেন। সেখানে বসেই তিনি মদ্যপান করতেন, যা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য চরম অপমানজনক। বিষয়টি নিয়ে স্কুলের শিক্ষক ও স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি।
মঙ্গলবার বিকেলে হাইদচকিয়া বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে ঢুকে হঠাৎ রাশেদ চৌধুরী ক্লাস চলাকালে শ্রেণীকক্ষে ঢুকে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক রতন কান্তি চৌধুরীকে বারান্দা থেকে টেনেহিঁচড়ে অফিস কক্ষে নিয়ে যান। এসময় তাকে ইট দিয়ে আঘাত করতে থাকেন। প্রধান শিক্ষক সুনব বড়ুয়া বাঁধা দিতে গেলে তাকেও উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকেন তিনি। পরে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এসে অভিযুক্তকে আটক করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় অভিযুক্তকে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনার পরপর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষ দখলে রাখার বিষয়টি সামনে আসে।
গত মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিনে বিদ্যালয়ের চারতলার একটি কক্ষ দখল করে রাত কাটানোর জন্য বিছানা পেতে রাখলেও বুধবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, নিজের দায় এড়াতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা (ভারপ্রাপ্ত) লাকী বড়ুয়া দপ্তরীকে দিয়ে সেই কক্ষের তালা ভেঙ্গে বিছানাপত্রসহ জিনিসপত্র অন্যত্র সরিয়ে নেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, ‘স্কুলে অতীতে সভাপতির দায়িত্বে থাকার কারণে তিনি নিজেকে প্রভাবশালী মনে করেন। আমরা কিছু বললে উল্টো আমাদের ওপর চিৎকার-চেঁচামেচি করেন।’
শিক্ষার্থীরা জানান, ‘রাশেদ চৌধুরী মাঝেমধ্যেই শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে শিক্ষকদের সঙ্গে উঁচুস্বরে কথা বলেন। হঠাৎ করে তিনি ওপরের কক্ষ থেকে নেমে এসে ক্লাসে চিল্লাচিল্লি শুরু করেন। এতে আমরা ভয় পাই এবং মনোযোগ নষ্ট হয়, যা পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করে।’
এ ঘটনায় অভিভাবকরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক বলেন, একজন সাবেক সভাপতির এমন আচরণে স্কুলের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুদ্দিন সুমন বলেন, ‘এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা। স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের উচিত অবিলম্বে ওই কক্ষ শিক্ষার কাজে ব্যবহার করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড বন্ধ করা।’
এদিকে অভিযুক্ত রাশেদ চৌধুরী মঙ্গলবার হাইদচকিয়া বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষককে মারধর করার মামলায় জেলহাজতে থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষিকা (ভারপ্রাপ্ত) লাকী বড়ুয়া বলেন, ‘তিনি স্কুলের সাবেক সভাপতি থাকার সময় থেকে কক্ষটি নিজের দখলে রেখেছেন। মাঝে-মধ্যে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে শিক্ষকদের সঙ্গে চেঁচামেচি করতেন। তিনি স্থানীয় ও প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে বিষয়টি আমরা কাউকে জানাতে পারিনি।
এ ঘটনায় তিনি দায় এড়াতে পারেন কিনা- এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। উল্টো তার পক্ষে সব কিছু দেখে-শুনে রাখা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাসান মুরাদ চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি আমরা জেনেছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে পরামর্শ করে দ্রুত সুরাহা করা হবে।’
ইউএনও মো. মুজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘এটি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গাফিলতির ফল। কোনো প্রতিষ্ঠাতা বা সভাপতির স্কুল কক্ষ ব্যবহারের অধিকার নেই। প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’