তরিকুল ইসলাম মিঠু, যশোর
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৫ ১২:০৫ পিএম
অনিয়ম-দুর্নীতির ঘেরাটোপে মুখ থুবড়ে পড়েছে যশোরের বেজপাড়ার সরকারি মৎস্য হ্যাচারিটি। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
অব্যবস্থাপনা আর অনিয়ম-দুর্নীতির ঘেরাটোপে পড়ে সম্ভাবনাময় যশোরের মৎস্য হ্যাচারিটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। এতে পর্যাপ্ত জনবল ও বরাদ্দ সবই আছে। কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম-দুর্নীতির কবলে পড়ে এক সময়ের সুনাম বয়ে আনা এই মৎস্য হ্যাচারি দেড়যুগ ধরে মাছ চাষিদের কল্যাণে কোনো কাজে আসছে না।
অথচ সরকারের লক্ষ্য হলো মৎস্য হ্যাচারিটির প্রান্তিক মাছ চাষিদের পাশে থাকবে। মাছ চাষিদের মাছ উৎপাদনে বিশেষ অবদান রাখবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পরেও এবং হ্যাচারি উন্নয়নে সরকারি বরাদ্দের টাকা সুকৌশলে গিলে খাচ্ছে এর কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
খোঁজ-খবর নিয়ে জানা যায়, যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র মনিহার ও আইটি পার্কের মধ্যবর্তী বেজপাড়ায় ১৯৬১ সালে প্রায় ১৯ বিঘা জমির ওপরে সরকারি মৎস্য হ্যাচারিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল এ অঞ্চলে মৎস্য উন্নয়নের জন্য অবদান রাখবে।
রেণুপোনা উৎপাদনের জন্য এই হ্যাচারির মধ্যে খনন করা হয় আটটি পুকুর। স্থাপন করা হয় উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ও আবাসিক স্থাপনা।
সেই সময় থেকে এখানে মা মাছ উৎপাদন, ডিম সংরক্ষণ ও বাচ্চা উৎপাদনে এটি প্রসিদ্ধ ছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এটি ভঙ্গুর হয়ে এখন প্রায় বন্ধ। সরকারি মালিকানাধীন বাঁওড়ে রেণুপোনা সরবরাহে অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
১০ হাজার রেণুপোনা ছাড়লে বিল করা হয় ২০ হাজার রেণুপোনার। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে রেণুপোনা কিনে তা সরবরাহ করা হয়। চাকরি বাঁচাতে খাতা-কলমে বেশি উৎপাদন দেখিয়ে সরকারের বিশাল অঙ্কের টাকা তছরুপ করা হচ্ছে বলে হ্যাচারির কর্মকর্তারা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মৎস্য বীজ উৎপাদন ও রেণু উৎপাদনে লক্ষ্যে হ্যাচারি মেরামত ও সংস্কারের জন্য সরকার বরাদ্দ দেয় পাঁচ লাখ ত্রিশ হাজার টাকা। নাম সর্বস্ব কাজ দেখিয়ে এসব টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
হিসেবে নিলে দেখা যাবে বছরে হ্যাচারির পেছনে সরকারকে অর্ধকোটি টাকা ঢালতে হয়। কিন্তু এ থেকে সরকারের আয় বছরে অতি ন্যূনতম। মাত্র পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা।
বসুন্দিয়ার ঘুনি গ্রামের মাছ চাষি ময়নাল হাসান বলেন, আমি ক-বার সরকারি মাছের হ্যাচারিতে গিয়েছি। কিন্তু কখনও কোনো রেণুপোনা পাইনি। গেলেই বলে এখন কার্যক্রম বন্ধ আছে। সব সময় যদি বন্ধ থাকে তাহলে সরকারের এই সম্পদ ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী পুষে লাভ কী। এখানে প্রতি শতক জায়গার দাম কম করে হলেও অর্ধকোটি টাকা। তাহলে এগুলো ইজারা বা সরকারি মার্কেট করে দিলেও বছরে সরকারের কয়েক কোটি টাকা আয় হবে।
অভয়নগরের মৎস্য চাষি রেজওয়ান আহমেদ বলেন, আমরা কয়েকবারই কম দামে ভালো মানের রেণুপোনা কেনার জন্য হ্যাচারিটিতে গিয়েছি। কিন্তু সেখান থেকে বলা হয় তাদের কার্যক্রম বন্ধ আছে। বিপুল পরিমাণ জায়গা ও জনবল থাকা সত্ত্বেও এখানে সরকারের কোনো আয় হয় না। এটি এ অঞ্চলের প্রান্তিক মাছ চাষিদের কোনো উপকারে আসছেন না। অথচ এখান থেকে এক কিলোমিটার দূরে চাঁচড়ায় বেসরকারি মালিকানায় প্রায় অর্ধশতধিক হ্যাচারি করে তারা বছরে কোটি কোটি টাকা আয় করছেন। অথচ সরকারি মৎস্য হ্যাচারি কার্যক্রম বন্ধ থাকে। এখানকার মাছ চাষিদের কল্যাণে এটি কাজে লাগছে না। কিন্তু একটা সময় এখানকার মাছ চাষিদের একমাত্র রেণুপোনা সংগ্রহের কেন্দ্র ছিল এই সরকারি হ্যাচারিটি।
যশোর চাঁচড়া মৎস্য সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম বলেন, আশির দশকে যশোরের চাঁচড়ায় বেসরকারি মৎস্য হ্যাচারি বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করে। তবে ২০১০ সালের পর থেকে বেসরকারি হ্যাচারিগুলোয় দেশি-বিদেশি জাতের মাছের পোনা উৎপাদনের ক্ষেত্রে রীতিমতো বিপ্লব ঘটতে শুরু করে। অল্প মূলধন ও পুকুর নিয়ে এ ব্যবসা নেমে অনেকেই সফল হয়েছেন। কোটিপতিতে পরিণত হয়েছেন।
দেশের মোট উৎপাদিত রেণু মাছের মধ্যে যশোরে বেসরকারি মৎস্য হ্যাচারিতে উৎপাদিত হয় ৭০ শতাংশ রেণুপোনা উৎপাদিত হয়।
সরকারি মৎস্য হ্যাচারিটি দিনদিন রুগ্ন হওয়ার কারণ জানতে চাইলে এর ব্যবস্থাপক লিপি পাল বলেন, আমাদের এখানে সঠিক সময়ে বরাদ্দ না পাওয়া এবং জনবল সংকটে আমরা সবসময় হ্যাচারি চালু রাখতে পারি না।