হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৫ ২৩:৩৪ পিএম
সরবরাহ কমের অজুহাতে আবারও বাড়ছে পেঁয়াজের দাম। সাড়ে ৪ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে পেঁয়াজ আমদানি। ফলে কমছে দেশি পেঁয়াজের মজুদ। দেশের অন্যতম পাইকারি পণ্যের আড়ত চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের দাবি, এজন্যই বাজারে বাড়ছে পেঁয়াজের দাম।
জুলাই মাসের শেষে খাতুনগঞ্জে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। অথচ মাত্র দুই সপ্তাহ না পেরোতেই সেঞ্চুরি ছোঁয়ার পথে হাঁটছে পণ্যটি। গত ১২ আগস্ট খাতুনগঞ্জে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৮০-৮৫ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে কেজিতে দাম বেড়েছে অন্তত ২৫ টাকা। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও কেজিতে ২৫ টাকা বাড়ায় পণ্যটির বাজারে তৈরি হয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। হঠাৎ কেন দাম বাড়ল?Ñ এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, মজুদ কমে যাওয়ার সেই চিরচেনা অজুহাত। তবে ব্যবসায়ীরা মজুদ কমার দোহাই দিলে সাধারণে মনে করছেন, আবারও সিন্ডিকেট করেই বাড়ানো হয়েছে দাম।
এদিকে ব্যবসায়ীরা মজুদ কমার কথা জানালেও কৃষকরা বলছেন, পেঁয়াজের মজুদ এখনও স্বাভাবিক রয়েছে। কৃষকদের দাবি, গত মৌসুমে যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে তাতে দেশি পেঁয়াজ দিয়েই আরও অন্তত দেড় থেকে দুই মাস চাহিদা মেটানো যাবে।
তবে দুই সপ্তাহ ধারাবাহিকভাবে খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের দাম বাড়লেও গত বুধবার এই পাইকারি বাজারে দাম কিছুটা কমেছে। আগের দিনের তুলনায় কেজিতে ৪-৫ টাকা কমে এদিন বিক্রি হয়েছে ৭৫ থেকে ৮০ টাকায়।
নগরীর কাজীর দেউড়ি বাজারের মেসার্স জীবন গ্রেসারির বিক্রয় প্রতিনিধি মোহাম্মদ হোসাইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দুই দিন ধরেই ৮৫ টাকা করে পেঁয়াজ বিক্রি করছি। তবে অনেকেই এখন ৯০ টাকায় বিক্রি করছেন।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংঘনিরোধ উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানির অনুমতিপত্র দেওয়া বন্ধ আছে। এর আগে যেসব অনুমতিপত্র নেওয়া হয়েছিল ১ এপ্রিলের পর সেগুলো বাতিল করা হয়। এই হিসেবে গত ১ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত গত সাড়ে চার মাসে দেশে কোনো পেঁয়াজ আমদানি হয়নি।
পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ থাকায় দেশে উৎপাদিত পণ্যটির মজুদ কমছে। আর এই মজুদ কমার কারণেই বাজারে পণ্যটির দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। খাতুনগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, দেশের কৃষকরা যাতে পেঁয়াজ বিক্রি করে ভালো দাম পান সেজন্য এবার সরকার আমদানি বন্ধ রেখেছে। সংরক্ষিত পেঁয়াজে চাহিদা মেটাতে গিয়ে কৃষক পর্যায়ে মজুদ কমছে।
মজুদ যত কমবে, ততই পেঁয়াজের দাম বাড়বে বলেও জানান ব্যবসায়ীরা। এ সম্পর্কে খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্টক থেকে পেঁয়াজ কমে যাওয়ার কারণেই দাম বাড়ছে। সাড়ে চার মাসে ধরে আমরা দেশি পেঁয়াজ খাচ্ছি। এই সাড়ে চার মাস তো পেঁয়াজের উৎপাদন নেই। এখন মজুদ কমে গেছে। যার কারণে দাম বাড়ছে।’
মজুদ বাড়াতে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখনই অনুমতি দেওয়া ঠিক হবে না। গত মৌসুমে আমাদের যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে, তাতে আরও এক থেকে দেড় মাস দেশি পেঁয়াজ দিয়েই চলবে। দেশি পেঁয়াজ শেষ হওয়ার আগে আমদানির অনুমতি না দিলেই ভালো।’
তবে ভিন্ন কথা বলছেন ফরিদপুরের পেঁয়াজ চাষি মোহাম্মদ মামুন। বৃষ্টির কারণে পেঁয়াজ বাজারজাত করতে ঝামেলা হওয়ায় দাম বাড়ছে উল্লেখ করে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘এখনও যে পরিমাণ পেঁয়াজ মজুদ আছে তাতে আরও অন্তত দু থেকে আড়াই মাস চলবে। বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেক কৃষক সংরক্ষণ করা পেঁয়াজ বাজারজাত করছেন না। তাই বাজারে একটু দাম বেড়ছে।’
আবহাওয়া ভালো হলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং দাম কমে আসবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
পেঁয়াজ চাষি মামুনের কথারই প্রতিধ্বনি শোনা গেল স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের কাছে। তাদের অভিযোগ, আড়তগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণ পেঁয়াজ মজুদ আছে। কিন্তু বৃষ্টি হলেই আড়তগুলো সরবরাহ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে বিক্রি কমিয়ে দেয়। ফলে বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। হু হু করে দাম বাড়ে। মাঝ থেকে গচ্চা যায় ভোক্তার।