জাকিরুল ইসলাম, হালুয়াঘাট (ময়মনসিংহ)
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৫ ১৬:৪৭ পিএম
আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ২০:৫৭ পিএম
গ্রামের পথ ধরে প্রায় ১০০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে মুরগির খামার। খামারের আশেপাশে ঘনবসতি এলাকা। খামারে থাকা মুরগির বিষ্ঠা থেকে প্রতিদিন কয়েক টন বর্জ্য হয়। এসব বর্জ্যের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আশেপাশের চারটি গ্রামে। তীব্র দুর্গন্ধে ওই গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বর্জ্য ফেলা হচ্ছে পাশের নদীতে। এতে বাড়ছে দূষণ, পাশাপাশি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। এলাকাবাসী বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো লাভ হচ্ছে না। তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এমন চিত্র ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার জুগলী ইউনিয়নের কালাপাগলা গ্রামের। এই গ্রামে অন্তত ১০ বছর ধরে গড়ে তোলা হয়েছে ‘রানা ফার্ম অ্যান্ড হ্যাচারী’ নামে একটি মুরগির খামার। এই খামারের তীব্র দুর্গন্ধে আশেপাশের কালাপাগলা, জুগলী, সোহাগপুর, জয়মঙ্গলসহ কয়েক গ্রামের হাজারো মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খামারের ভেতর বড়বড় পুকুর করে বর্জ্য ও কেমিক্যাল জমিয়ে রাখা হয়। কোনো প্রকার নিয়মনীতি না মেনে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই রাতের আঁধারে বুড়ি ভোগাই নদীতে ফেলা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে খামার কর্তৃপক্ষের এমন কর্মকাণ্ডে বুড়ি ভোগাই নদীর পরিবেশ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এছাড়া বর্ষা এলেই পুকুরে জমানো বর্জ্য উপচে পড়ছে ফসলি জমিতে। এই পানির কারণে জমিতে ফসল হচ্ছে না। নদী-খালের পোকামাকড় মরে যাচ্ছে। নদীর পানি ব্যবহারে মানুষ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এক সময় স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি ও মৎস্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো নদীটি। বর্তমানে নদীটিতে মাছ নেই।
শুধু স্থানীয়রাই নয়, হালুয়াঘাট-নালিতাবাড়ি উপজেলায় গাড়ি দিয়ে চলাচল করা হাজারো মানুষকে কালাপাগলা এলাকায় এসে দুর্গন্ধে নাক চেপে ধরে যেতে হয়। দুর্গন্ধের কারণে এসব এলাকায় মাছি বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিশু-বৃদ্ধদের ওপর।
অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি সরকারি নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে এবং প্রশাসনের কাউকে না জানিয়ে সদ্য মেরামত করা ‘কালাপাগলা-জয়মঙ্গল’ সড়ক কেটে বর্জ্য ও জমে থাকা পানি নদীতে ফেলার জন্য আরেকটি নতুন ড্রেন করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘আমরা নিরুপাই অইয়া এইনো থাহি, খামারের পচা জিনিস (বর্জ্য) গাংগে ছাড়লে ঘরে আর থাহুন যায়না। অভিযোগ দিলে লাভ অইনা। অফিসার আইয়া কিছু ট্যাহা পায়, পড়ে আর কোন খবর থাহেনা। আমরা ভালো ভাবে বাচবার চাই।’
স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানিয়া তাবাচ্ছুম বলেন, ‘রাত্রে পড়েতে গেলে গেন্ধের কারণে থাকা যায় না। রুমাল দিয়ে নাকমুখ চেপে রাখতে হয়। আমাদের পড়াশোনারও সমস্যা হয়’।
সোহাগপুর গ্রামের বাসিন্দা কুলছুম বেগম বলেন, ‘রাইত রাইত ড্রেন দিয়া বর্জ্য ছাড়ে। আমারা খুব কষ্টে থাহি। গন্ধের লাইগ্যা এলাকায় কেউ আত্মীয়ও করতে চায়না। এমনে আত্মীয়স্বজনরাও বিপদে পড়ে আইলেও থাকতে চায়না, বলে গন্ধে থাহুন যায়না তেগো অইনো। এই বিষয়ে কেউ তো কোন বিহীত করলো না’।
তবে রানা ফার্ম অ্যান্ড হ্যাচারী ম্যানেজার শাহীন আলম মঠোফোনে জানান, সবকিছু নিয়মের মধ্যে হচ্ছে। এছাড়া নতুন করে সড়ক কেটে ড্রেন নির্মাণের বিষয়ে তিনি জানান, এ বিষয়ে স্থানীয় মেম্বারকে জানানো হয়েছে। এছাড়া উপজেলার কারো অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলী নূর খান বলেন, রানা ফিডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে। গত সোমবার এ ব্যাপারে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক (ময়মনসিংহ) মো. রোকন মিয়া বলেন, এ ব্যাপারে গত মঙ্গলবার সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়েছে। খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।