সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০২২ ২১:৫৪ পিএম
আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২২ ২১:৫৭ পিএম
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার গাড়াদহ ইউনিয়নের গাড়াদহ দক্ষিণপাড়া গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পে ১৪টি ঘরের মধ্যে সাতটি ঘর অন্যের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। স্ট্যাম্পের মাধ্যমে কিনে নেওয়া ব্যক্তিরা এখন ওই ঘরগুলোতে বাস করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘর বরাদ্দের তালিকা প্রনয়ণে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ব্যাপক অনিয়মের কারণেই এমনটা ঘটেছে। তবে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জনপ্রতি দুই শতক জমি ও প্রতিটি ঘর নির্মাণে সরকার ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। অথচ বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এসব ঘর বিক্রি করেছেন মাত্র ৮০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকায়। এছাড়া ঘর বরাদ্দ প্রাপ্তদের তালিকায় ভুল মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছে, যাতে তাদের সঙ্গে কেউ যোগযোগ করতে না পারেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৪ নম্বর ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন আব্দুস সালাম ও তার স্ত্রী সেলিনা বেগম। স্ট্যাম্পের মাধ্যমে ওই ঘরটি ১ লাখ টাকায় কিনে সেখানে বসবাস করছেন সিরিনা বেগম ও তার পরিবার। ১০ নম্বর ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন বেল্লাল হোসেন ও তার স্ত্রী ছারা খাতুন। এই ঘরটি ৮০ হাজার টাকায় কিনে সেখানে বসবাস করছেন আনু ও তার স্ত্রী সাবিনা বেগম। ৮ নম্বর ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন রশিদ দম্পতি, তবে ওই ঘরে বাস করছেন জাহের ও তার পরিবার।
এছাড়া ৯ নম্বর ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন ঠাণ্ডু দম্পতি। ঘরটি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় কিনে সেখানে বসবাস করছেন পিঞ্জিরা খাতুন ও তার সন্তানেরা। ১৩ নম্বর ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন রফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ফুলমালা। তাদের কাছে থেকে ১ লাখ টাকায় কিনে সেখানে বসবাস করছেন নাজমুল ও তার পরিবার। ১৬ নম্বর ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন বিধবা রেশমা খাতুন। এই ঘর ১ লাখ টাকায় কিনে সেখানে বসবাস করছেন হাফিজুল ও তার স্ত্রী নাছিমা খাতুন। ১৭ নম্বর ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন জহুরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী আফরোজা বেগম। ঘরটি ১ লাখ ১১ হাজার টাকায় কিনে সেখানে বসবাস করছেন হালিমা বেগম ও তার পরিবার।
এসব ঘরে বাস করা ব্যক্তিরা টাকা দিয়ে ঘর কেনার কথা স্বীকার করেছেন। ঘর কেনার কাজে ব্যবহার করা কিছু স্ট্যাম্পের ছবিও প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে এসেছে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমাদের কোনো বাড়িঘর নাই। আবেদন করেও আমরা ঘর বরাদ্দ পাইনি। তাই নিরুপায় হয়ে বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তির কাছে থেকে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে ঘর কিনে বসবাস করছি।’
ঘর বিক্রির বিষয়ে ১৪ নম্বর ঘরের বরাদ্দ পাওয়া সেলিনা বেগম বলেন, ‘ঘর বিক্রির একটি টাকাও আমরা পাইনি। এ টাকা নিয়েছেন ডিজিটাল ভিশন বিদ্যানিকেতন কেজি স্কুলের মালিক জুয়েল আহম্মেদ। তিনিই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।’
এ বিষয়ে জুয়েল আহম্মেদ বলেন, ‘একটি টাকাও আমিও নিইনি। তবে একটি ঘর বিক্রির সময় সেখানে উপস্থিত ছিলাম।’
এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি বরাদ্দ দিয়েছেন শাহজাদপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি)। তালিকা প্রনয়ণ করেছেন শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। আমি শুধু তালিকা অনুয়ায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছি। কাজেই এ বিষয়ে উনারাই ভালো বলতে পারবেন। এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নাই।’
অভিযোগের বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) লিয়াকত সালমান বলেন, ‘ঘর বরাদ্দে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি। তাদের অভিযোগ সঠিক নয়। ভালো করে যাচাইবাছাই করেই ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে শাহজাদপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাদিয়া আফরিন বলেন, ‘ঘর বরাদ্দে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি। তাদের অভিযোগ সঠিক নয়। ভালো করে যাচাইবাছাই করেই ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যাদের নামে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কেবলমাত্র তারাই ওই ঘরে বসবাস করতে পারবেন। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর কোনোভাবেই বিক্রি বা হস্তান্তরের সুযোগ নেই। সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বিক্রি করা আইনত অপরাধ। এ বিষয়ে এক সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে এর সত্যতা পাওয়া গেলে ঘর বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
তবে তদন্ত কর্মকর্তার নাম জানাননি ইউএনও সাদিয়া আফরিন।