× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শহীদের ছবি নিয়ে আজও কাঁদছেন স্বজনরা

জুয়েল সাহা বিকাশ, ভোলা

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ১১:৩৫ এএম

শহীদের ছবি নিয়ে আজও কাঁদছেন স্বজনরা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পার হলেও এখনও ভোলার শহীদ পরিবারগুলোর শোক কাটেনি। আজও তাদের থামেনি কান্না। প্রিয়জনের সেই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন পরিবার সদস্যরা। প্রিয়জনকে হারানোর সেই দিনের স্মৃতি ভুলতে পারছেন না তারা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মা-বাবা হারিয়েছেন তাদের সন্তানকে ও স্ত্রী হারিয়েছেন স্বামীকে এবং সন্তানরা হারিয়েছেন তার বাবাকে। আবার কেউ হারিয়েছেন তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জন সক্ষম মানুষটিকে। ঘটনার এক বছর পার হলেও এখনও সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত হয়নি কয়েকজন।

সরেজমিন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা ও ভোলা সদর উপজেলার গিয়ে কথা হয় কজন শহীদ পরিবারের সঙ্গে। সেখানে গিয়ে দেখা যায় প্রিয়জনকে হারানোর এক বছর পার হলেও আজও কান্না থামেনি স্বজনদের। অবুঝ শিশুরা এখনও রয়েছে তাদের বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়। কিন্তু তারা জানে না, তাদের বাবা আর কোনো দিনই ফিরে আসবেন না। 

চরফ্যাশনের নুরাবাদ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চর তোফাজ্জল গ্রামের মিলন ফরাজীবাড়ির শহীদ ওমর ফারুকের মা ইয়ানুর বেগমের এখনও কান্না থামেনি। সন্তানহারা এই মা শোকে কাতর হয়ে আছেন। ছেলের ছবি বুকে নিয়ে কাঁদছেন তিনি। 

ইয়ানুর বেগম জানান, তার তিন সন্তানের মধ্যে শহীদ ওমর ফারুক দ্বিতীয়। অভাবের কারণে বড় দুই সন্তানকে পড়াশোনা করাতে পারেননি। প্রায় ৫ বছর আগে ঢাকায় যান পরিবারের অভাব দূর করতে। ওমর ফারুকে একটি দোকানের কর্মচারীর কাজে দেন। তার স্বামী মিলন ফরাজী ঢাকায় দারোয়ানের কাজ করতেন। তিনি বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী ও বড় ভাই নাঈম মিষ্টির দোকনের কর্মচারীর কাজ করতেন এবং ছোট ছেলে পড়তেন তৃতীয় শ্রেণিতে। পরিবারে সবাই থাকতেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। সবাই মিলে কাজ করায় ভালোই চলছিল তাদের সংসার।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অংশ নেয় ১৬ বছরের কিশোর ওমর ফারুক।

তিনি আরও জানান, ওই দোকান মালিকের বাড়িতেই থাকতেন। ৪ আগস্ট ওমর ফারুক সকালে নাস্তা করে দোকানে না গিয়ে আসে মায়ের কাছে। মা ওমরকে জিজ্ঞাস করলে বলে আজ দোকানে যাবেন না। ছেলে দুপুরে বাসায় খাবে। তাই মা বাজার করতে যান। বাজার করে বাসার কাছাকাছি আসলে, স্থানীয়রা তাকে জানান ওমর আন্দোলনে গিয়ে মোহাম্মদপুরের ওভারব্রিজ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পরে তিনি তার বড় সন্তানসহ স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে ছেলেকে খোঁজতে বের হন। পরে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গুলিতে আহত ছেলেকে দেখতে পান।

তখন থেকেই তার কান্না শুরু। সেই কান্না আর থামেনি। ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে সন্তানহারা মা ইয়ানুর বেগম সন্তানের কথা ভুলতে পারেন না।

ভোলা সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশা ইউনিয়নের গুপ্তমুন্সি গ্রামের হাওলাদার বাড়ির শহীদ শামীম হাওলাদারের মা বিউটি বেগমেরও কান্নাও থামেনি। তিনি জানান, শামীম ঢাকায় বিদ্যুতের কাজ করত। প্রতিদিনই মায়ের সঙ্গে কথা হয় শামীমের। ঘটনার দিন ২০ জুলাই ছেলের সঙ্গে দুপুরেও কথা হয় মায়ের। তখনও সুস্থ ছিলেন শামীম হওলাদার। কিন্তু সন্ধ্যার একটু আগে ফোন আসে শামীম গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাকে কেউ স্পষ্ট না বললেও তিনি বুঝতে পারেন শামীম আর নেই।

শহীদ শামীমের স্ত্রী রোকেয়া বেগম আসমা জানান, তাদের ছোট তিন সন্তান। বড় ছেলে তৃতীয় শ্রেণিতে, মেজ ছেলে শিশু শ্রেণিতে ও ছোট ছেলের বয়স মাত্র ৪ বছর। ২০ জুলাই দুপুরের দিকে কথা হয় তার সঙ্গে। ছোট ছেলের সঙ্গেও কথা হয় শামীমের। ওই দিন শামীম আন্দোলনে গিয়ে দুপুরের দিকে রাবার বুলেটবিদ্ধ হয়। সে কথা শুনে তিনি আর আন্দোলনে না যাওয়ার জন্য বলেন। ওই সময় তার ছোট ছেলেও বাবাকে অনুরোধ করেন আন্দোলনে না যাওয়ার জন্য। এটাই ছিল তাদের সঙ্গে শামীম হাওলাদারের শেষ কথা।

পরে সন্ধ্যার দিকে জানতে পারেন বিকালের দিকে শামীম মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় আন্দোলনে গিয়ে গুলিতে শহীদ হয়েছেন। পরে তার লাশ গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।

এদিকে ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শাহমাদার গ্রামের শহীদ হাসানের বাবা মনির হোসেন ও ছোটবোন সোমাইয়া আক্তার জানান, ৫ আগস্ট আন্দোলনে রাজধানী যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনে গিয়ে গুলিতে শহীদ হন তার ছেলে হাসান। অভাবের কারণে কয়েক বছর আগে ঢাকার কাপ্তান বাজার এলাকায় এরশাদ মার্কেটের দুলাভাইয়ের ইলেকট্রনিক্সের দোকানে চাকরি নেন। অসুস্থ মা-বাবার ও ছোট দুই ভাইবোনের লেখাপড়ার দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। থাকতেন যাত্রাবাড়ীর বোনের বাড়িতে। ৫ আগস্ট হাসান শহীদ হলেও তার লাশ তখন খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে তারা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ও মর্গে খুঁজতে থাকেন। অবশেষে জানুয়ারি মাসের দিকে ঢাকা মেডিকেল মর্গে থাকা কয়েকটি অজ্ঞাত লাশের মধ্যে প্রাথমিকভাবে হাসানকে শনাক্ত করে তার পরিবার। পরে ডিএনএ পরীক্ষায় গত ১৩ ফেব্রুয়ারিতে হাসানের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

তিনি আরও জানান, হাসান শহীদ হওয়ার এক বছর পার হলেও এখনও শহীদ হাসানের নাম সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত হয়নি। তার পরিবার সরকারি কোনো সহযোগিতাও পাননি। ফলে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের। তবে ভোলা জেলা প্রশাসক আজাদ জাহান জানান, সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদ হওয়ার ভোলার এ পর্যন্ত ৪৭ জন শহীদের নাম গেজেটভুক্ত হয়েছে। শহীদ হাসানের নাম অল্প কিছু দিনের মধ্যেই গেজেটভুক্ত হবে বলে আশা করছি। এ ছাড়া আরও কিছু শহীদের পরিবার আবেদন করেছে। আমরা যাচাই-বাচাই করে গেজেটভুক্ত করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাব।

তিনি আরও জানান, জেলা প্রশাসকের পক্ষে থেকে শহীদ পরিবারকে কয়েকবার আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে। কিছু দিনের মধ্যে দুই লাখ টাকা করে শহীদ পরিবারকে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভোলার সমন্বয়ক রাহিম ইসলাম জানান, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রাজধানী ঢাকা, ভোলা, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ভোলার অর্ধশতাধিক শহীদ হয়েছেন। এদের মধ্যে সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত হয়েছেন ৪৭ জন। বাকিদেরও দ্রুত সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত করার দাবি করেন তিনি। এ ছাড়া তিনি শহীদ ও আহত পরিবারের জন্য সরকারিভাবে সব ধরনের সহযোগিতারও দাবি জানান।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা