রাসেলের শেষ কথা
আরেফিন লিমন, গলাচিপা (পটুয়াখালী)
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ১১:০৪ এএম
রাসেল মাহমুদ
এক বছর আগে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক উত্তাল দিনে, ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ২১ বছরের রাসেল মাহমুদ। পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাজীবনে সংগ্রামী এই তরুণের মৃত্যু শুধু একটি জীবনহানিই ছিল না- তা ছিল একটি সময়ের প্রশ্নের উত্তর, একটি আন্দোলনের জেগে ওঠা এবং একটি প্রজন্মের আত্মনিবেদন। আজ তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে পুরো চরশিবা গ্রাম ও দেশের সচেতন তরুণ সমাজ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে তাকে।
তার স্বপ্ন, আদর্শ ও অসমাপ্ত লড়াই আজ অনেকের কাছে প্রেরণার বাতিঘর। তার ফেসবুকে লেখা শেষ লাইনটা ছিল ‘জন্ম ভাগ্যের, মৃত্যু সময়ের আর মৃত্যুর পর বেঁচে থাকা কর্মের’Ñ যেন বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরকাজল ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চরশিবা গ্রামের বাসিন্দা রাসেল। বাবা আবুল হোসেন দিনমজুর, মা রাসেদা বেগম গৃহিণী।
বাবা কঠোর পরিশ্রম করেছেন ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে। রাসেল নিজেও কখনও টিউশনি, কখনও ফল, কখনও কাঁচা বাজারে সবজি বিক্রি করে চালিয়ে গেছেন নিজের পড়াশোনা।
২০২০ সালে চর শিবা আব্দুস ছালাম আকন আইডিয়াল স্কুল থেকে এসএসসি পাস ও ২০২২ সালে ঢাকার শ্যামপুর বহুমুখী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বাংলা বিষয়ে অনার্স কোর্সে ভর্তি হন সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটিতে। থাকতেন যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ায়।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা যখন আন্দোলনে যোগ দেয় সেই সময় আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল রাসেলও। ৫ আগস্ট সরকারের পতনের দিন রাসেল মাহমুদ যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনে নামলে পুলিশের এলোপাথাড়ি গুলি তার মাথায় লাগে। বিকালের দিকে রাসেলের মায়ের কাছে ফোন আসে, রাসেল আপনার কী হয়? তার মাথায় গুলি লেগেছে। সঙ্গে সঙ্গে মা রাসেলের বড় ভাই মিরাজের কাছে ফোন দেয়।
তাকে বলে রাসেলের কোনো এক বন্ধু ফোন দিয়ে বলেছিল গুলি লেগেছে। সে সময় রাসেলের বুকে ইউনিভার্সিটির আইডি কার্ড ও মাথায় বাংলাদেশের পতাকা ছিল। রাসেলের বড় ভাই খবর পেয়ে খালাত ভাই আজিজুল ও মামা আলমগীর হোসেনকে খবর দেয়। রাসেলকে বিভিন্ন হাসপাতালে খুঁজ করা হলেও কোথায়ও পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন ৬ আগস্ট খুঁজতে খুঁজতে ঢাকা মেডিকেল মর্গে তার নিথর দেহ পায় পরিবার। রাসেলের মাথায় পিছন থেকে গুলি লেগে কপাল দিয়ে বের হয়ে যায়।
রাসেলের মা রাসেদা বেগম বলেন, ‘ছেলেকে লেখাপড়ার শিখে মানুষ হওয়ার জন্য ঢাকা পাঠিয়েছিলাম, শয়তানরা মানুষ হতে দিল না, বাড়িতে ফিরল লাশ হয়ে। যারা আমার ছেলেকে মারছে তাদের যেন বিচার হয়।’
রাসেলের সঙ্গে শেষ কথা হয় ৪ আগাস্ট। সেদিন রাসেল বলেছিল ‘মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী। মা, তোমার তিন ছেলের মধ্যে আমি যদি দেশের জন্য চলে যাই, তুমি দুই ছেলেকে নিয়ে থাকবা। অনুমতি দাও মা।’
বাবা আবুল হোসেন বলেন, টাকা পাঠাতে না পারলে রাসেল একটি প্রাইভেট পড়াত, নিজে ফল বিক্রি করত, এমনকি কাঁচা বাজারের সবজিও বিক্রি করত। মাঝে মাঝে টাকা দিলে নিতো, না পারলে বলত আর লাগবে না।
রাসেলের বড় ভাই মিরাজ বলেন, ছোট ভাই চলে গেল, কিন্তু রেখে গেল সাহস, দৃঢ়তা আর প্রতিবাদের ভাষা।
স্থানীয়দের দাবি, রাসেল মাহমুদ নেই, কিন্তু তার স্বপ্ন আজও তরুণদের পথে হাঁটতে শেখায়। রাসেলের নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হোক। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই শহীদ সন্তানকে এলাকাবাসী স্মরণ করেছেন গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।