হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৫ ১৩:৪৩ পিএম
ফাইল ফটো
গত বছরের ৫ জুন, রাত আনুমানিক ১০টা। শহর থেকে শাটল ট্রেন ক্যাম্পাসে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে যান শতাধিক শিক্ষার্থী। সেখানে দাঁড়িয়ে স্লোগান দেন, ‘সকল কোটা বাতিল হোক, যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি হোক’।
এটিই ছিল কোটাব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রতিবাদে চট্টগ্রামে প্রথম বিক্ষোভ। ওই দিন রাতেই ঘণ্টাখানেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে জুলাই আন্দোলন। জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণের প্রতিবাদ স্লোগান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম শহরে। জুলাইয়ের শেষে ও আগস্টের শুরুতে সেটি রূপ নেয় গণআন্দোলনে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।
জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, চট্টগ্রামে জুলাই অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে একপর্যায়ে যুক্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এরপর শহরে ছড়িয়ে পড়ার পর তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণের কারণেই কোটাব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনটি একপর্যায়ে সরকার পতনের গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে ৯ জুন বিক্ষোভ করে কোটাব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রতিবাদে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন শিক্ষার্থীরা। ওই দিন দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা জানান, হাইকোর্টের দেওয়া কোটাব্যবস্থা পুনর্বহালের এ রায় বাতিল করা না হলে কঠোর আন্দোলনে যাবেন। জুনের মাঝামাঝিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণের এই প্রতিবাদ স্লোগান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম শহরে। জুলাইয়ের শেষে সেটি রূপ নেয় গণআন্দোলনে। কোটা সংস্কার আন্দোলন মোড় ঘুরে পরিণত হয় সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে। চট্টগ্রামের নিউমার্কেট, আদালত পাড়া, মুরাদপুর, ষোলশহরে দিনভর চলে মিছিল, সমাবেশ হামলা আর সংঘর্ষ। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিকাল থেকে মধ্যরাত রণাঙ্গনে লড়ে যান ছাত্র, যুবক, রিকশাচালক, মিস্ত্রিসহ সর্বস্তরের মানুষ।
আগস্টের শুরুতে বন্দরনগরীর নিউমার্কেট ও আদালত পাড়া হয়ে ওঠে আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ৪ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিতে সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা নিউমার্কেট মোড়ে জড়ো হতে থাকেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ। সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে শতাধিক ছাত্র ও সাধারণ মানুষ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।
কোটাব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ কীভাবে গণআন্দোলনে রূপ নেয় জানতে চাইলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সমন্বয়ক সৈয়ব আহমেদ সিয়াম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আদালতের রায়ের পর ৫ জুন রাতে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটাব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রতিবাদে আমরা বিক্ষোভ করি। প্রথম দিন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও আমাদের সঙ্গে বিক্ষোভে ছিলেন। আমরা স্লোগান দিয়েছিলাম ‘শেখ হাসিনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’। সরকারের পক্ষে থেকেই আমরা বিক্ষোভ করেছিলাম। এরপর ৬ জুন একই দাবিতে শহীদ মিনারে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিই। ঘোষণা অনুযায়ী, কর্মসূচি পালন করি। কিন্তু ওইদিন আমরা যেই পরিমাণ উপস্থিতি আশা করেছি, সেটি হয়নি। পরে জানতে পারি ছাত্রলীগ নেতারা ওই কর্মসূচিতে অংশ না নিতে অনেককে হুমকি দিয়েছে। তাই অনেকে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেনি। এরপর ৭ জুন শুক্রবার থাকায় ওই দিন কর্মসূচি ছিল না। ৮ জুন আমি নিজে এককভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়াই। ৯ জুন পুনরায় শহীদ মিনারে কর্মসূচি পালন করি। ওইদিন প্রায় ১০০ জনের মতো শিক্ষার্থী কর্মসূচিতে অংশ নেন। একই ধারাবাহিকতায় ১০ ও ১১ জুন আমরা ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করি। পরে ঈদুল ফিতরের কারণে কর্মসূচি স্থগিত ছিল।
তিনি আরও বলেন, প্রথম দিকে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করি। শিবিরসহ বিভিন্ন সংগঠন তখন বলছিল এটি সরকারের পাতানো আন্দোলন। ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তির বিষয় আড়ালে রাখতেই হয়তো এটি করা হচ্ছে। এরপর ১ জুলাই পর্যন্ত আমরা কোনো কর্মসূচি পালন করিনি। তবে প্রতিদিন আমরা ক্যাম্পাসে বৈঠক করতাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২০-২১ সেশনে শিক্ষার্থী সৈয়ব আহমেদ সিয়াম বলেন, ঈদের পর ১ জুলাই ও ২ জুলাই আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে কর্মসূচি পালন করি। ৩ জুলাই আমরা প্রথম শহীদ মিনার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটে হাটহাজারী সড়কে গিয়ে অবস্থান করি। প্রথম দিন আমরা ৩০ মিনিটের মতো সেখানে ছিলাম। এরপর ৪ জুলাই একই স্থানে আমরা হাটহাজারী সড়ক অবরোধ করে আবার কর্মসূচি পালন করি। এটি আমরা এই কারণে করি, কারণ আমরা আন্দোলন করলেও গণমাধ্যমে কোনো কাভারেজ পাচ্ছিলাম না।
৫ জুলাই থেকেই শহরে প্রথম আন্দোলন শুরু হয় জানিয়ে সৈয়ব আহমেদ সিয়াম বলেন, প্রথমবার আমরা শহরে আন্দোলন শুরু করি। ৫ জুলাই প্রায় ৫০০ জনের মতো আমরা প্রথমে ষোলশহর স্টেশনে অবস্থান নিই। পরে সেখান থেকে মিছিল নিয়ে আমরা দুই নম্বর গেট এলাকায় যাই। আবার সেখান থেকে মিছিল নিয়ে আমরা ষোলশহর স্টেশনে চলে আসতাম। এর মধ্যে আমাদের সঙ্গে শিবির, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনও সংহতি জানিয়ে আন্দোলন শুরু করে। সবার আগে ৩ জুলাই আমাদের সঙ্গে আন্দোলন শুরু করে ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা। এরপর ছাত্রদল। তাদের পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজের শিক্ষার্থীরাও আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রথমে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয় ইসলামিক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। এভাবে আমরা ১০ জুলাই পর্যন্ত শহরে আন্দোলন করার পর ১১ জুলাই পুলিশ আমাদের ওপর হামলা চালায়। এরপর ১২ জুলাই আন্দোলনে প্রায় ১০ হাজারের মতো লোকজন অংশ নেন। একই ভাবে ১৩ ও ১৪ জুলাই শহরে কর্মসূচি পালন করি।
তিনি আরও বলেন, ১৪ জুলাই শহরে কর্মসূচি পালন করে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পর আমরা রাতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করলে ছাত্রলীগ আমাদের লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এরপর ১৫ জুলাই আন্দোলনে অংশ নিতে শহরে যাওয়ার জন্য শাটল ট্রেনে যাই। তখন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শাটল ট্রেনে এসে হুমকি-ধমকি দেয়। একপর্যায়ে রাফিকে তুলে নিয়ে যায়। এ সময় আমরা তাকে উদ্ধার করতে প্রক্টর অফিসের দিকে যাওয়ার সময় আমাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় ছাত্রলীগের হামলায় সিএসই বিভাগের মাহবুব রক্তাক্ত হন। জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে এটিই ছিল প্রথম রক্তপাত। এরপরই আন্দোলন আরও বেগবান হয়। কারণ ক্যাম্পাসে যখন ছাত্রলীগ রাফিকে তুলে নিয়ে যায়, ওই একটি অংশ তখন শহরে আন্দোলন করছিল। এরপর ১৬ জুলাই আমরা আবারও শহরে আন্দোলন শুরু করি। ওইদিন ছাত্রলীগ, যুবলীগ আমাদের ওপর হামলা চালায়, হামলায় ওই দিন প্রথম চট্টগ্রামে তিনজন শহীদ হন। এরপরই আন্দোলন পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে।