রাজু আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ১৬:০৮ পিএম
ফাইল ফটো
ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে জুলাইজুড়ে উত্তাল ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। আন্দোলনের শুরুর দিকে রাবি শিক্ষার্থীরা রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক ও রেল অবরোধ, ক্লাস বর্জন কর্মসূচি পালন করে আসছিল। বিক্ষোভ মিছিল ও স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে রেখেছিল পুরো ক্যাম্পাস। বিভিন্ন কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ছিলেন শিক্ষকরাও।
কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা ১৭ জুলাই রাবি প্রশাসন ভবনে ভিসিকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। তৎকালীন রাবি প্রশাসন আন্দোলন দমাতে না পেরে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সহযোগিতা নেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ক্যাম্পাসে ঢুকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ছাত্রদের ওপর টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে ভিসিকে বের করে নিয়ে আসেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এদিকে এই ঘটনায় আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আন্দোলনকারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
১ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে ‘ছাত্র-জনতার খুনিদের প্রতিহত করুন’ ব্যানারে মুখে লাল কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও নগরীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। মিছিল চলাকালে সাদা পোশাকধারী পুলিশ সদস্যরা শিক্ষার্থীদের জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় শিক্ষকেরা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে তাদের কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের ছাড়িয়ে নিয়ে রক্ষা করেন। এই ঘটনাটি সে সময় পুরো দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
জুলাইজুড়ে রাবির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ রাজশাহী শহরের তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। যাদের অধিকাংশই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। তবে আন্দোলনকারীদের দমাতে ১৬ জুলাই থেকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামে আওয়ামী লীগের সবপক্ষ। এদিন সন্ধ্যায় নগরীর জিরো পয়েন্ট ও মনিচত্বর এলাকায় ব্যাপক তাণ্ডব চালায় তারা।
তারই ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট দুপুরে নগরীর আলুপট্টিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন প্রতিহত করতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা দাঙ্গা পুলিশের পাশে একত্রিত হয়। এসময় ছাত্র-জনতা নগরীর পূর্ব দিক থেকে আন্দোলন নিয়ে আসলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন দুই তরুণ, আহত হন শতাধিক। এ সময় আওয়ামী লীগের চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা পুলিশের সামনেই অস্ত্র নিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা করে। সেসব অস্ত্র এখনও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
জুলাই আন্দোলনের পুরো সময়জুড়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা গ্রেপ্তার আতঙ্কে ছিলেন। রাবির উর্দু বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী রাশেদ রাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জুলাইয়ের সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রাশেদ রাজন বলেন, ‘২৯ জুলাই রাজশাহী কোর্ট স্টেশন এলাকা থেকে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখান থেকে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হয় আরএমপির ডিবি কার্যালয়ে। দুই তলায় চোখ-মুখ বেঁধে সারারাত ধরে চালানো হয় নির্যাতন। ডিবির একজন প্রশ্ন করে, আরেকজন অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও মারধর করে। এভাবে চলতে থাকে সরারাত। এরপরের দিন মতিহার থানায় নিয়ে গিয়ে দেওয়া হয় বিস্ফোরক আইনে মামলা। ৫ আগস্টের পর আমি মুক্তি পাই। শেখ হাসিনার পতন না হলে আমি মুক্তি পেতাম না। কোনো এক অন্ধকার কক্ষে হয়তো পচে মরতে হতো।’
তিনি আরও জানান, ‘জুলাই আন্দোলনের শুরুর দিকে আন্দোলনকে বেগবান ও সুসংগঠিত করতে ১৭ জন শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে ‘সমন্বয়ক পরিষদ’ গঠন করি। তারাই সে সময় পুরো আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। প্রশাসন তাদের চিহ্নিত করতে আমাকে টার্গেট করে। গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দা সংস্থা আমাকে দিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে। তবে তারা ব্যর্থ হয়।’
রাশেদ রাজনের সঙ্গে সেই আন্দোলনে অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন রাবির সাবেক সমন্বয়ক ও সমাজকর্ম বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মেহেদী সজীব। তিনি জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, কারফিউয়ের নিস্তব্ধতা ভেঙে ২৯ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টায় রাবির ফটকে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। আমার মনে সেদিন প্রথমবারের মতো মৃত্যুভয় জেগেছিল। মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার পর সেই ভয় রূপান্তরিত হয় দৃঢ় সংকল্পে। পুলিশ ও বিজিবির কঠোর অবস্থানের মধ্যেই প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নকিবসহ (বর্তমান ভিসি) শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় আমরা মিছিল বের করি। দিনের শেষে কিছুটা স্বাভাবিকতার আভাস মিললেও রাত নামতেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। কোর্ট স্টেশন এলাকায় সাদা পোশাকের পুলিশ আমাদের সঙ্গী রাজন ভাইকে তুলে নিয়ে যায়। আমি ও ফাহিম দ্রুত পালিয়ে যাই। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে এক শিক্ষকের সহায়তায় একটি নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নেই। এই ঘটনাটি ছিল সেদিনের আন্দোলনের এক খণ্ডচিত্র, যা ভয়, ত্যাগ ও প্রতিরোধের এক জীবন্ত দলিল।