কক্সবাজার অফিস
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৫ ১৮:২৬ পিএম
আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৫ ১৮:৩৩ পিএম
শহীদ তানভীর। ছবি: সংগৃহীত
‘সন্তান একদিন বড় হয়ে সংসারের হাল ধরবে—এই স্বপ্নেই ছিলাম আমরা। এখন সেই স্বপ্নটাই বুকের ভেতর কবর হয়ে আছে।’ এভাবে কথাগুলো বলতে বলতে কাঁদছিলেন শহীদ তানভীরের বাবা বাদশাহ মিয়া। চোখের কোণে জমে থাকা জলের কণাগুলো শুধুই অশ্রু নয়—তা যেন দীর্ঘ বঞ্চনার দলিল, হারানো ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি।
বাদশাহ মিয়া কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কালারমার ছড়ার বাসিন্দা। বর্তমানে পুত্রহারা শোক আর অসহায় জীবনের গ্লানি নিয়ে বেঁচে আছেন তিনি।
বাদশাহ মিয়া হারিয়েছেন তার প্রিয় সন্তান তানভীর সিদ্দিকীকে—যিনি ছিলেন কালারমার ছড়ার এক নির্যাতিত পরিবারের সন্তান। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে পরিবারটি এলাকা ছেড়ে অন্যত্র একটি ঝুপড়ি ঘরে আশ্রয় নেয়। সেই দুঃসহ বাস্তবতায়ও তানভীর পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন চট্টগ্রামের সরকারি আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজে। এইচএসসি শেষ করে হয়তো কোনো চাকরির খোঁজে নামতেন বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিতেন—কিন্তু তার আগেই থেমে গেল সব। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই, সেই বিক্ষুব্ধ দিনে।
তানভীর সিদ্দিকী শুধু বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন না,তার হৃদয়ে ছিল সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, বৈষম্যহীন একটি ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা। তিনি যুক্ত হয়েছিলেন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির সঙ্গে, যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ। উদ্দেশ্য ছিল কোটা সংস্কার, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূর এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। তিনি আন্দোলনের সামনের সারির একজন না হলেও, ছিলেন তাদেরই একজন—যারা ভয়কে জয় করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে জানে।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই, বিকাল ৪টার দিকে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় চলছিল শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি। সেই শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হঠাৎ গুলির শব্দ—চড়াও হয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশ। চিৎকার, দৌড়, আতঙ্ক—আর ছিন্নভিন্ন হতে থাকা তরুণ শরীরের দৃশ্য। তানভীরের দেহেও লাগে গুলি। রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তানভীরের বাবা বাদশাহ মিয়া একজন পান বিক্রেতা। রোদে-বৃষ্টিতে ভাঙা ঝুপড়ির নিচে দাঁড়িয়ে তিনি যা আয় করতেন, তার বেশিরভাগই খরচ করতেন সন্তানের পড়াশোনায়।
‘নিজে না খেয়ে থেকেছি, কিন্তু ছেলেকে খাইয়ে-পড়িয়ে মানুষ করেছি। পানের টাকায় বই-খাতা কিনেছি—শুধু ছেলের মুখে হাসি দেখার জন্য বেঁচে ছিলাম,’ বলেন তিনি কাঁদতে কাঁদতে।
পুত্র হত্যার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত অনুদান ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এই পান বিক্রেতা। তিনি বলেছিলেন— ‘ছেলের লাশের টাকা আমার গলা দিয়ে নামবে না।’
তানভীরের মা আজও সন্ধ্যা হলে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। মনে হয়, তার ছেলে বুঝি হেঁটে এসে বলবে, ‘মা, আমি এসেছি।’ কিন্তু তিনি জানেন, সেই প্রতীক্ষার আর কোনো শেষ নেই।
২০১৩ সালে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতৃত্বে তাদের বসতভিটা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। রাতের আঁধারে ঘরছাড়া হয়ে আশ্রয় নেন শ্বশুরবাড়ির এক ঝুপড়ি ঘরে—যার অর্ধেক খোলা। রোদে-গরমে, বৃষ্টিতে, শীতের হিম হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে এখনো সেখানেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা।
ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তানভীর সিদ্দিকী আজ শুধু একটি নাম নয়—তিনি এক প্রতীক, এক প্রশ্ন, এক জেগে থাকা বিবেক।