শরীফ স্বাধীন, মাগুরা
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৫ ১০:৪৬ এএম
আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৫ ১১:২৫ এএম
মাগুরায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ১০ শহীদের মধ্যে চারটি পরিবারে এখন চলছে গভীর টানাপোড়েন, অভিযোগ আর অবিশ্বাসের সঙ্কট। সরকারের দেওয়া অনুদান আশীর্বাদের পরিবর্তে হয়ে উঠেছে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সম্পর্ক ভাঙনের কারণ। শহীদ পরিবারের মায়েদের আকুতি ‘দূরে সরে গেছে ছেলের বউ আর নাতি-পুতিরা। এটা কি জানতাম ছেলে দেশের জন্য জীবন দিলে পরিবারের মধ্যে সম্পর্কের ফাটল ধরবে?’ শহীদ পরিবারের সদস্যরা প্রশ্ন ‘দেশের জন্য জীবন দিলে পরিবারের বন্ধনই বা ছিন্ন হবে কেন?’
সরকারি সহায়তার উদ্দেশ্য ছিল শহীদ পরিবারের ভিতকে দৃঢ় করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনুদান পাওয়ার পরপরই পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র বিভাজন ও পারস্পরিক দোষারোপ। শহীদের মায়েরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন ছেলের পরিবার থেকে, পুত্রবধূরা হয়েছেন সন্দেহ ও অবিশ্বাসের শিকার। শহীদ সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন।
সরেজমিন ১০ শহীদ পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মাগুরা সদর উপজেলার বরুনাতৈল গ্রামের শহীদ আলামিন হোসেন (৪২) ৫ আগস্ট সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। একই গ্রামের শহীদ মেহেদী হাসান রাব্বী (৩৪) ৪ আগস্ট শহরের পারনান্দুয়ালী এলাকায় নিহত হন। তার মৃত্যুর সময় স্ত্রী ছিলেন চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শ্রীপুর উপজেলার বরইচারা গ্রামের শহীদ মুক্তাকিন বিল্লাহ (২৫) ১৯ জুলাই ঢাকার মিরপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। একই উপজেলার মহিলা কলেজ পাড়ার শহীদ সোহান সাহ (২৮) ১৯ আগস্ট ঢাকার রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধী অবস্থায় মারা যান। এই চার শহীদ পরিবারের মধ্যে এখন চলছে দুঃসহ সম্পর্কচ্যুতি।
মুক্তাকিন বিল্লাহর স্ত্রী নাঈমা এরিন নিতু বলেন, ‘শুধু টাকায় নিরাপত্তা আসে না। এই অনুদান আমাদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি বাড়িয়েছে। শাশুড়ি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বেড়ান।’ তিনি জানান, সরকারের দেওয়া সঞ্চয়পত্রটি চার বছরের সন্তানের নামে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে মুক্তাকিনের মা রহিমা বেগম বলেন, ‘বউমা টাকা না দিক, অন্তত নাতিটা কাছে রাখলে ছেলের শোক কিছুটা ভুলে থাকতে পারতাম।’
শহীদ আল-আমিনের মা সূর্য বেগম বলেন, ‘ছেলে বাদাম বিক্রি করে সংসার চালাত। এখন তার স্ত্রী সন্তান নিয়ে বাপের বাড়ি থাকে। সরকারের দেওয়া সব টাকাই তার কাছে।’
আল-আমিনের স্ত্রী বলেন, ‘টাকা ভাগ করে দিলে সন্তানের ভবিষ্যৎ কীভাবে গড়ে তুলব?’
শহীদ সোহানের স্ত্রী শম্পা খাতুন জানান, ‘এই অনুদানের টাকার কারণেই স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তিনি চান এই অনুদানের একটা নির্ধারিত বন্টন নীতি থাকুক।’
সোহানের মা সুপিয়া বেগম অবশ্য বলেন, ‘ছেলের বউ নিজেই চলে গেছে। ছেলে আমাকে খরচ পাঠাতো, এখন তো কেউ নেই। পরিবার নিয়ে খুব সংকটে আছি।’
শহীদ মেহেদী হাসানের পরিবারের সদস্যরাও অনুদান বণ্টনে সরকারের নির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবের সমালোচনা করেন।
শহীদ পরিবারগুলোর দাবি একটি স্থায়ী সহায়তা কাঠামো তৈরি। যেখানে আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব থাকবে। আত্মত্যাগের মূল্য যেন বিভাজন না হয়—এই আশা নিয়েই তারা চাইছেন সমাধান।
মাগুরার জেলা প্রশাসক মো. অহিদুল ইসলাম জানান, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী অনুদান হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে পরিবারগুলোর কিছু অভিযোগ পেয়েছি, মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে দ্বিতীয় ধাপের অনুদান বিতরণ হয়, সেই দিকনির্দেশনা থাকলে এমন সমস্যা কমে আসবে।