রাজিব আহমেদ, কালকিনি (মাদারীপুর)
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৫ ১৭:০৩ পিএম
মাদারীপুরের চর সাহেবরামপুর ও লঞ্চঘাট এলাকায় পানি কমায় আড়িয়াল খাঁ নদের পাড়ের বেশ কয়েকটি জায়গায় দেখা দিয়েছে ভাঙন। প্রবা ফটো
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার সাহেবরামপুর ইউনিয়নের নতুন আন্ডারচর ও উত্তর আন্ডারচর গ্রামে আড়িয়াল খাঁ নদের পানি কমতে থাকায় তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে দুই শতাধিক পরিবার সরাসরি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং এলাকাবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নদীভাঙন থেকে রক্ষা পেতে এবং স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবিতে মঙ্গলবার দুপুরে মানববন্ধন করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নয়, ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য দ্রুত প্রকল্প গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করতে হবে। না হলে প্রতিবছরই আড়িয়াল খাঁর গর্ভে বসতভিটা ও জীবিকা হারাবে আরও অসংখ্য পরিবার।
স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সাহেবরামপুর ইউনিয়নের নতুন আন্ডারচর লঞ্চঘাট ও উত্তর আন্ডারচর এলাকার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে আড়িয়াল খাঁ নদ। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এই এলাকাগুলোতে ভাঙন দেখা দিলেও এবার তার মাত্রা অনেক বেশি। ইতোমধ্যে একটি গ্রামীণ কাঁচা সড়কের প্রায় ৫০০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ঝুঁকিতে রয়েছে বঙ্গবন্ধু কলেজ, ৭৩ নম্বর নতুন আন্ডার প্রাথমিক বিদ্যালয়, নবারুন উচ্চ বিদ্যালয়, ইমদাদুল উলুম দাখিল মাদ্রাসা, আল মাহমুদ হাফিজিয়া মাদ্রাসা, করিমখানের হাট পোস্ট অফিস ও গোলপাতা বাজারসহ একাধিক সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, শিক্ষা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।
সরেজমিন চর সাহেবরামপুর ও লঞ্চঘাট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পানি কমায় আড়িয়াল খাঁ নদের পাড়ের বেশ কয়েকটি জায়গায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ফলে লঞ্চঘাট থেকে চর সাহেবরামপুর যাওয়ার একমাত্র সড়কটির প্রায় ৫০০ মিটার অংশ নদে বিলীন হয়ে গেছে। সড়কের অপর পাশের অনেকে বসতবাড়ি ভেঙে নিয়ে অন্যস্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সি চাঁন মিয়া জানান, গত দশ বছরে তার প্রায় তিন বিঘা ফসলি জমি আড়িয়াল খাঁর গর্ভে বিলীন হয়েছে। এখন নদীর পাড়ে সরকারি জায়গায় একটি টিনশেড ঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন তিনি।
হতাশার সুরে চাঁন মিয়া বলেন, ‘নদের ওই পাড়ে আমার বাপ-দাদাগো বাড়িঘর ছিল, এখন আর কিচ্ছু নাই। তিনবার আমাগো বাড়িঘর নদের পেটে গেছে। জায়গাজমি যা ছিল, সবই শ্যাষ। কত যে না খাইয়া থাকছি, হিসাব নাই। নদীতে যাগো সব লইয়া যায়, তাগো তো আর অস্তিত্ব থাকে না।
একইভাবে তার প্রতিবেশী ৭৫ বছর বয়সি বজলু সরদার বলেন, ‘আমি বোঝার বয়স থেকে সাতবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছি। এখন আমার নিজের নামে কিছুই নাই। শুনছিলাম সরকার নাকি আমাগো একখান ঘর দিব, কই তা-ও আহে না। না দিল কোনো ঘর, না দিল কোনো খাওন। আমি কোনো কাম করতে পারি না। এক পোলায় বদলা দেয়, তাই দিয়া আমাগো সংসার টিক্কা আছে।’
নদীভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াসহ স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে গত মঙ্গলবার মানববন্ধন করেছে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তরা।
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বক্তব্য দেন স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মোকলেছুর রহমান, প্রধান শিক্ষক আবুল হালিম, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোয়াজ্জেম হোসেন, শিক্ষক মো. আরাফাত হোসেন প্রমুখ। তারা আড়িয়াল খাঁর ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের দাবি জানান।
মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শুভ সরকার বলেন, তিনি কালকিনি সাহেবরামপুর ইউনিয়নের দুটি এলাকায় আড়িয়াল খাঁর ভাঙন দেখে গেছেন। দুটি এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়েছে। ভাঙন রোধে প্রাথমিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
কালকিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফ উল আরেফিন জানান, লঞ্চঘাট এলাকায় ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা ও পুনর্বাসনের জন্য তালিকা করা হচ্ছে।