ভূঞাপুর
আতিফ রাসেল, ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল)
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৫ ১৯:১১ পিএম
আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৫ ১৬:১৬ পিএম
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে বিদ্যুৎ সংযোগ ও লাইনের সংস্কারের নামে ঠিকাদার ও সাব-ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বিদ্যুৎ অফিসের আওতাধীন ঘাটাইল পশ্চিমাঞ্চল ফিটারের বিভিন্ন মহল্লায় বিদ্যুৎ লাইন চলছে বাঁশের খুঁটি ও ফাটা তারে। সামান্য বাতাসেই ভেঙে পড়ে খুঁটি, বিচ্ছিন্ন হয় পড়ে লাইন। অতঃপর শুরু হয় দিনের পর দিন বিদ্যুৎবিহীন দুর্ভোগ।
এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি পেতে বিদ্যুৎ অফিস ও ঠিকাদারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন গ্রাহকরা। কিন্তু এখানে যেন চলে টাকার ভয়ংকর খেলা। যে বেশি ঘুষ দিতে পারেন, তার কাজই আগে হয়। এ প্রতিযোগিতায় কেউ টিকে থাকছেন, কেউ আবার প্রতারিত হচ্ছেন বারবার।
ঘাটাইল ফিটারের অন্তর্গত যোগিহাটি থেকে বাইশকাইল কবরস্থান পর্যন্ত মাত্র ১২টি এলটি খুঁটি বসিয়ে লাইন সংস্কারে জন্য ২ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। মজনু মিয়ার বাড়ির দিকে আরও একটি সংযোগ নিতে লেগেছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কাগমারিপাড়া থেকে যোগিহাটি পর্যন্ত লাইন মেরামতে ঘুষ দিতে হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এমনকি একটি মাত্র খুঁটি বসিয়ে লাইন নিতে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
এমন চিত্র শুধু এক এলাকায় নয়, ভূঞাপুর বিদ্যুৎ অফিসের আওতাধীন অধিকাংশ জায়গায়ই একই চিত্র। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রকল্প চলাকালীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোটি টাকার বেশি ঘুষ আদায় করেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঠিকাদারের যোগসাজশ রয়েছে।
২০২২ সালের অক্টোবরে দেশব্যাপী গ্রিড বিপর্যয়ের পর জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) একটি সমীক্ষা চালায়। এরপরই বিদ্যুৎ গ্রিডের স্থিতিশীলতা বাড়াতে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশে বড় পরিসরে প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এই প্রকল্পে ভূঞাপুর বিদ্যুৎ অফিসও যুক্ত হয়।
প্রকল্প সূত্র জানায়, ভূঞাপুরে লাইন সংস্কার, নতুন সংযোগ, ওভারলোড নিরসন ও উপকেন্দ্র নির্মাণের দায়িত্ব পায় ‘পার্টনার কনস্ট্রাকশন’ ও ‘উত্তরা এন্টারপ্রাইজ’ নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজ করেন নয়ন ও শিপন নামে দুজন। তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও প্রকল্পের অর্ধেক কাজই শেষ হয়নি। খুঁটি বসানো হলেও অনেক জায়গায় তার নেই, কোথাও তার আছে কিন্তু সংযোগ নেই। এমন নাজুক অবস্থা চলছে দীর্ঘদিন ধরে।
এমনকি বিদ্যুৎ বিভ্রাটে গ্রাহকের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। বারবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মিলছে না। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বারবার লিখিত ও মৌখিকভাবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সাব-ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক গুরুতর অভিযোগ। লাখ লাখ টাকার ঘুষ আদায়, পুরাতন ও নতুন তার বিক্রি, এমএস (স্টিল) ও কংক্রিটের খুঁটি ভেঙে রড বিক্রি করা ইত্যাদি। একাধিক বিদ্যুৎ অফিস কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ঠিকাদার নয়ন ও ইঞ্জিনিয়ার মিলনের সঙ্গে প্রকল্প কর্মকর্তাদের সরাসরি আর্থিক লেনদেন রয়েছে।
সাব-ঠিকাদার নয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘুষের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘শ্রমিকদের নাস্তা বাবদ সামান্য কিছু টাকা নেওয়া হয়, এটা ঘুষ না।’ তিনি অভিযোগ তোলেন, ‘বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন ট্রান্সমিটারও ঘুষ ছাড়া দেয় না।’
সম্প্রতি আবারও এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন ঠিকাদার নয়ন। অভিযোগ উঠেছে, নতুন সংযোগ দিতে গিয়ে আবারও ঘুষের দর কষাকষি করছেন তিনি। এতে গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে হতাশা তৈরি হয়েছে। অনেকে আগেই টাকা দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু এখনও সংযোগ পাননি।
এ বিষয়ে ভূঞাপুর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার কামরুজ্জামান বলেন, ‘প্রকল্প চলাকালীন অবস্থায় আমাদের অফিসে কোনো বরাদ্দ থাকে না। ফলে আমরা সেবা দিতে পারি না। এতে গ্রাহকরা আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ছেন।’
জাইকা প্রকল্পের (ময়মনসিংহ জোন-২) নির্বাহী প্রকৌশলী তারেক সিফাতীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।