নিম্নচাপের প্রভাব
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৫ ২২:১২ পিএম
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তাল হয়ে ওঠা সমুদ্রের বিক্ষুব্ধ ঢেউয়ে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে ভাঙন ও জোয়ারের পানিতে প্লাবনসহ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, নোয়াখালীর নিঝুমদ্বীপ, চরফ্যাশন, রাঙ্গাবালী, কুতুবদিয়া, বাউফল, ঝালকাঠি ও সেন্টমার্টিন দ্বীপ। প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদকদের পাঠানো প্রতিবেদনেÑ
কক্সবাজার : বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে অস্বাভাবিক জোয়ারের ঢেউয়ে বালিয়াড়ি ধসে পড়েছে, উপড়ে গেছে কয়েক হাজার ঝাউগাছ। এ ছাড়া শনিবার (২৬ জুলাই) সমুদ্রসৈকতের কক্সবাজারের কয়েকটি পয়েন্ট দেখা মেলে ভাঙনের তীব্রতা। ভাঙনে সৈকতের একটি ওয়াচ টাওয়ার সাগরে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যালয় ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামসহ বহু স্থাপনা। শৈবাল পয়েন্টে দুটি বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর ঝাউগাছ ভেঙে পড়ায় আশপাশের এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল দুপুর পর্যন্ত। পরে সেই গাছ কেটে সরিয়ে নেওয়া হলেও ঝুঁকিতে রয়েছে আরও কিছু খুঁটি।
বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ঝাউগাছ রোপণ করা হলেও প্রতিটি দুর্যোগেই এগুলোর বড় অংশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আধুনিক বাঁধ নির্মাণ না হলে উপকূল রক্ষা সম্ভব নয় বলে জানান বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এই এলাকায় প্রতিবছর জিও ব্যাগ বসিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
সেন্টমার্টিন : তিন দিন ধরে বন্ধ রয়েছে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌযান চলাচল। খাদ্য ও ওষুধ সংকটে পড়েছে দ্বীপবাসী। ১-৩ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাসে শতাধিক ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। দ্বীপের চারপাশে জিও ব্যাগ বা ব্লক না ফেললে মানচিত্র থেকে সেন্টমার্টিন হারিয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এতে করে আতঙ্কে রয়েছেন দ্বীপের সাড়ে ১১ হাজার বাসিন্দা। এদিকে উত্তাল সাগরে ভেসে আসা একটি ট্রলারে ২০ রোহিঙ্গা দ্বীপে আশ্রয় নেয়। বিজিবির হেফাজতে থাকা এই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি আবহাওয়া খারাপ থাকায়।
শাহপরীর দ্বীপ : টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপে ২০২২ সালে নির্মিত ১৫১ কোটি টাকার বেড়িবাঁধের সিসি ব্লক ধসে পড়েছে। এতে ঝুঁকিতে ৪০ হাজার মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্নীতি ও তাড়াহুড়ার কারণে কাজের মান ছিল অত্যন্ত দুর্বল। জোয়ারের পানি বেড়িবাঁধ টপকে লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
কুতুবদিয়া : ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে গেছে কুতুবদিয়ার ১০টি গ্রামে। প্লাবিত হয়েছে ৭০০ পরিবার, মাছের ঘের ও ফসলি জমি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবহেলাকে দায়ী করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত চলছে।
চরফ্যাশন (ভোলা): উপজেলার হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে ঢেউয়ের আঘাতে খেজুর গাছিয়া বেড়িবাঁধের ২৫০ মিটার ভেঙে গেছে। ফলে সেখানকার প্রায় ২ হাজার পরিবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। জিও ব্যাগে ঢেকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে বরাদ্দকৃত ৪৫ লাখ টাকায় টেন্ডারে কাজ শুরু করেও দেড় মাসেও অর্ধেক কাজও শেষ করতে পারেনি ঠিকাদার। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় বিপর্যয় ঘটবে।
পটুয়াখালী : কুয়াকাটায় জোয়ারের ঢেউয়ে সৈকত লন্ডভন্ড হয়েছে। জাতীয় উদ্যান ও ডিসি পার্কের পাশে সড়ক ভেঙে পড়েছে। উপড়ে গেছে গাছপালা, প্লাবিত হয়েছে নিচু এলাকা, মাছের ঘের ও বসতভিটা। হোটেল-মোটেল মালিকদের দাবি, এখনই টেকসই প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নিলে পর্যটন শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।
রাঙ্গাবালী-বাউফল-ঝালকাঠিতে ভাঙন : রাঙ্গাবালীর চালিতাবুনিয়া, চরআন্ডা ও চরমোন্তাজে বেড়িবাঁধ ভেঙে বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বাউফলে অন্তত ২৫টি গ্রামে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে মানুষ। আমন বীজতলা, পুকুর-ঘের ডুবে গেছে। ঝালকাঠিতে নদীপাড়ের অন্তত ৫০টি গ্রাম প্লাবিত, ঘরবাড়ি, সড়ক ও বাজার পানির নিচে।
নোয়াখালী : শনিবার সকাল থেকে অস্বাভাবিক জোয়ার ও টানা বর্ষণে তলিয়ে গেছে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বিচ্ছিন্ন এলাকা নিঝুমদ্বীপ। হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি ঢুকে পড়েছে প্রতিটি বাড়িতে। রান্নাঘর, উঠান সবই পানির নিচে। স্ত্রী-সন্তান খাটের ওপর ঠাঁই নিয়েছেন, গবাদিপশু কোনোভাবে দাঁড়িয়ে আছে কাঁচা সড়কে। প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকটে রয়েছেন। মাছের ঘের ভেসে গেছে, শাকসবজি ও ধানের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। ইউপি সদস্য কেফায়েত হোসেন বলেন, নিঝুমদ্বীপ এখন জলাবদ্ধতার দ্বীপ। বেড়িবাঁধ না থাকায় আমরা প্রতিবছরই ডুবে যাই।
সমুদ্র উত্তাল থাকায় মাছ ধরার ট্রলার উপকূলে ফিরে এসেছে। ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ ধরার সুযোগ পেলেও দুর্যোগের কারণে জেলেরা জাল ফেলতে পারছেন না। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা বন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আরও কয়েক দিন বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাস ও দমকা হাওয়া চলবে। উপকূলজুড়ে ১-৩ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা রয়েছে।