রংপুর
মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৫ ২০:৫৩ পিএম
আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৫ ২১:৩৮ পিএম
‘আমি পায়ের দিকে তাকাতে পারি না। আমার পায়ের ওপর দিয়ে ট্রাক চলে গেছে। পঙ্গু জীবনটা নিয়ে আমাকে কে টানবে…’Ñ কথাগুলো বলতে বলতে অঝোরে কেঁদে ওঠেন ঠাকুরগাঁও বেতার কেন্দ্রের প্রিয় কণ্ঠ, বেতার শিল্পী মুনিবুন ফেরদৌস মনি।
একসময় যার কণ্ঠে মুগ্ধ হতো শ্রোতারা, যিনি শব্দের জাদুতে প্রাণ দিতেন বেতারের নাটক, সংবাদ আর অনুষ্ঠানেÑ আজ সেই মানুষটি শুয়ে আছেন হাসপাতালের বিছানায়, জীবনের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে। দু’পা হারিয়ে মৃত্যুর মতো নিষ্ঠুর নিস্তব্ধতা নিয়ে বাঁচার লড়াই করছেন। একটি দুর্ঘটনা শুধু তার শরীর নয়, ভেঙে দিয়েছে তার স্বপ্ন, তার পথচলা।
৩৫ বছর বয়সি এই বেতারকর্মী দীর্ঘদিন ধরে উপস্থাপক, নাট্যশিল্পী ও সংবাদ পাঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ৩ জুলাই সকালে ঠাকুরগাঁও সালন্দর ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে বড় ভাইয়ের মোটরসাইকেলে করে কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন তিনি। পথিমধ্যে সালন্দর চৌধুরীহাট বাজার এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে যান। রাস্তার ওপর ছিটকে পড়া মনির ওপর দিয়ে একটি মালবোঝাই ট্রাক চলে গেলে তার দুটি পা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
তৎক্ষণাৎ ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে ভর্তি করার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য মুনিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। এখন তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের চিকিৎসক সানিউজ জাহান জানান, দুর্ভাগ্যজনকভাবে মনির দুই পা-ই কেটে ফেলতে হয়েছে। এখনও তার বাম পায়ে ইনফেকশন রয়েছে। তবে চিকিৎসা চলছে এবং ধীরে ধীরে তিনি কিছুটা স্থিতিশীল হচ্ছেন। বর্তমানে মনি ভালো রয়েছেন।
মনি অভিযোগ করেন, ‘আমরা শিল্পীরা প্রতিদিন ভোরে প্রচণ্ড শীত আর ঝুঁকি নিয়ে বেতারে পৌঁছাই। বহুবার বলেছি একটি গাড়ির ব্যবস্থা করতে, কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলে বাজেট নেই। অথচ আমাদের কণ্ঠ দিয়েই বেতার বাঁচে। আজ আমি আমার সেই দায়বদ্ধতার কারণেই জীবনভর পঙ্গু হয়ে গেলাম।’
মনির বড় বোন আক্তার জাহান জানান, আমার ভাই অবিবাহিত। ৮ ভাইবোনের মধ্যে সে সবার ছোট। বাবা মারা গেছেন ৩ বছর আগে। মা হার্টের রোগী। মনি-ই তার সেবাযত্ন করত। মা বারবার জানতে চান মনি কোথায়, কিন্তু তাকে কিছু বলতে পারছি না।
তিনি আরও বলেন, মনি কারও বোঝা হতে চায় না। সে শুধু চায় বেতারে স্থায়ী একটা চাকরি, যাতে সে নিজের কাজ দিয়ে কষ্ট ভুলতে পারে। সেই সঙ্গে কৃত্রিম পা সংযোজন ও উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারের সহায়তা প্রয়োজন।
মানবাধিকার কর্মী ও বেতার শিল্পী অ্যাডভোকেট জোবাইদুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি বেতার কেন্দ্রে শিল্পীদের জন্য গাড়ি বরাদ্দ থাকলেও তা কর্মকর্তাদের ব্যবহারে চলে যায়। এমন অনিয়মের ফলেই আজ মনির মতো শিল্পীরা জীবন দিয়ে দায় মেটাচ্ছেন। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই, মনির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্র নিক এবং বেতারে তার জন্য স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা করুক। সেই সঙ্গে বেতারে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করে সব শিল্পীর জন্য বরাদ্দকৃত গাড়ি যেন শিল্পীরা ব্যবহার করতে পারে সে ব্যবস্থাও করা হোক।