নিম্নচাপের প্রভাব
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৫ ২২:১৪ পিএম
আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৫ ২২:৫১ পিএম
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে দেখা দিয়েছে জলবায়ু সংকট। কক্সবাজার থেকে শুরু করে পটুয়াখালীর কলাপাড়া, গলাচিপা, ভোলার চরফ্যাশন, নোয়াখালীর নিঝুম দ্বীপ এবং সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকাগুলোতে জোয়ারের পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ভেঙে পড়েছে সড়ক, তলিয়ে গেছে বাড়িঘর, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষিজমি, মাছের ঘের ও জনজীবন।
প্রতিবেদকদের পাঠানো খবরÑ
কক্সবাজার : উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ঘনীভূত হয়ে নিম্নচাপে রূপ নেওয়ায় উত্তাল হয়ে উঠেছে সাগর। এর প্রভাবে কক্সবাজারের টেকনাফে মেরিন ড্রাইভ সড়কের অন্তত আড়াই কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। বাহারছড়া ঘাট থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ১০টি স্থানে সড়কের অংশবিশেষ ধসে পড়ে। স্থানীয়রা জানান, পূর্বের জিও ব্যাগ সুরক্ষা ব্যবস্থাও ঢেউয়ের আঘাতে কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এতে প্রায় দুই হাজার পরিবার সরাসরি ঝুঁকিতে পড়েছে। চাষযোগ্য জমিতে ঢুকে পড়েছে লবণাক্ত পানি, যা কৃষিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কক্সবাজার আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, নিম্নচাপটি বর্তমানে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থান করছে। এটি শুক্রবার বিকাল নাগাদ উপকূল অতিক্রম করতে পারে। নিম্নচাপ কেন্দ্রের ৪৪ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে বাতাসের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এর ফলে সমুদ্র এখন অত্যন্ত উত্তাল এবং চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
পটুয়াখালী : পায়রা বন্দর থেকে ১১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করা নিম্নচাপের প্রভাবে কলাপাড়া, রাঙ্গাবালী ও গলাচিপায় ঝোড়ো হাওয়া, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি এবং দুই দফা জোয়ারে বেড়িবাঁধের বাইরের এলাকা প্লাবিত হয়েছে। রাঙ্গাবালীর অন্তত ১০টি গ্রাম জলের নিচে। গলাচিপায় ফেরিঘাট, লঞ্চঘাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকাও তলিয়ে গেছে। যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে দূরপাল্লার যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন আটকা পড়েছে।
ভোলা : বৈরী আবহাওয়ার কারণে দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর শুক্রবার (২৫ জুলাই) সন্ধ্যায় ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুটে ফেরি চলাচল শুরু হলেও অধিকাংশ লঞ্চ রুট এখনও বন্ধ রয়েছে। ভোলার চরফ্যাশনে চরাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়ে শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ঢালচরসহ বেশ কয়েকটি চরে নেই আশ্রয়কেন্দ্র, ফলে রাতে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। অনেক এলাকায় বসতঘরে পানি ঢুকে পড়েছে।
চরফ্যাশন পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদদৌলা বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে চরফ্যাশন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আগামী ২৮ জুলাই পর্যন্ত এর প্রভাব থাকতে পারে। জোয়ারের পানি কোথায় বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে।
নোয়াখালী : নোয়াখালীর হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ পুরোপুরি তলিয়ে গেছে অস্বাভাবিক জোয়ারে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরপানি। মাছের ঘের ভেসে গেছে ও কৃষি ফসল তলিয়ে গেছে। বাড়িঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়ায় মানুষ খাটের ওপর ঠাঁই নিয়েছে, রান্নাবান্না বন্ধ। বেড়িবাঁধ ও পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রের অভাবে প্রতিবছরই এই দ্বীপবাসীকে ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। জোয়ারের পানিতে আটকা পড়ে দুর্ভোগে পড়েছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।
হাতিয়া উপজেলার ইউএনও মো. আলাউদ্দিন বলেন, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় সবার জীবন অনেক সংগ্রামের। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে চলতে হয়। জোয়ারের পানি নামতে শুরু করেছে, তবে রাতে আরেকবার জোয়ার হতে পারে। আমরা খোঁজ রাখছি। কোথাও কোনো ক্ষতি হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও আশপাশের ইউনিয়নগুলোতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ও নদীতে প্রবল স্রোতের কারণে নদীপাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কপোতাক্ষ নদে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্রতাপনগরের বেড়িবাঁধে ছিদ্র সৃষ্টি হয়, যা স্থানীয়দের প্রচেষ্টায় রক্ষা করা গেছে।
জেলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা রিপন হোসেন জানান, নিম্নচাপটি আরও ঘনীভূত হতে পারে এবং পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে। এ অবস্থায় উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।