হত্যা মামলা
এম আর ইসলাম রতন, নওগাঁ
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৫ ২০:৪০ পিএম
আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৫ ২০:৫১ পিএম
নওগাঁর আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গোয়ালবাড়ি এখন পুরুষশূন্য। গত তিন মাস ধরে ওই গ্রামের পুরুষরা এলাকা ছাড়া। গত এপ্রিল মাসে প্রকাশ্যে একটি হত্যার ঘটনায় খুনিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আর এ হত্যা মামলায় একই গ্রামের অজ্ঞাতনামা ১২০০ জন বাসিন্দার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর থেকে গোয়ালবাড়ি গ্রামের পুরুষরা গ্রেফতার আতঙ্কে তিন মাস ধরে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরের ৪ এপ্রিল বিকেল ৪টার দিকে গোয়ালবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা মাছ ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক (৩৫) পাশের বাগমারা উপজেলার রনশিবাড়ি হাটে মাছ বিক্রি শেষে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার সময় তার কাছে চাঁদা দাবী করেন একই গ্রামের মাদকাশক্ত আমিরুল ইসলাম (২৫)। চাঁদা দিতে না চাইলে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে আমিরুল পাশে থাকা কামারের দোকান থেকে একটি ধারালো চাকু রাজ্জাকের শরীরে ঢুকিয়ে দিলে কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মাছ ব্যবসায়ী রাজ্জাক। সেদিন ছিল ঐতিহ্যবাহী রনশিবাড়ি হাটের দিন। যে হাটে গোয়ালবাড়িসহ আশেপাশের ১২-১৫টি গ্রামের মানুষ আসেন। এই ঘটনার পর লোকজন উত্তেজিত হয়ে পড়লে আমিরুল নিজের প্রাণ বাঁচাতে রনশিবাড়ি গ্রামের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। খবর পেয়ে বাগমারা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সন্ধ্যে ৭টার দিকে ওই বাড়ি থেকে আমিরুলকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। এ সময় পুলিশ স্থানীয় লোকজনের বাধার মুখে পড়ে।
এক পর্যায়ে উত্তেজিত লোকজন আমিরুলকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নিয়ে হত্যার অভিযোগে বাগমারা থানার ভাগনদী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক গণি চৌধুরী বাদী হয়ে শুধুমাত্র গোয়ালবাড়ি গ্রামের অজ্ঞাতনামা প্রায় ১২শত জনকে আসামি করে মামলা করেন। এছাড়া মাছ ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক হত্যার ঘটনায় তার ভাই একরামুল প্রামাণিক বাদী হয়ে বাগমারা থানায় একটি মামলা করেন। এই মামলার একমাত্র আসামি আমিরুল ইসলাম মারা যাওয়ায় চার্জশিট দাখিলের আগেই মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। জোড়া খুনের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয়। পুলিশ বাদী হয়ে করা মামলায় অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও র্যাব। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সবাই আত্রাই উপজেলার গোয়ালবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা।
গোয়ালবাড়ি গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, আসামি অজ্ঞাত হওয়ার সুযোগে বাগমারা থানা পুলিশ স্থানীয় দালালদের ইন্ধনে মাঝেমাঝেই শুধুমাত্র গোয়ালবাড়ি গ্রামে আসামি ধরার নামে দিনরাত কয়েক দফা অভিযান চালিয়েছে। এছাড়া একটি দালাল চক্র মামলা থেকে নাম কেটে দেওয়ার নাম করে এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে নিরীহ মানুষদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়, এমন নিরীহ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আবার গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে ঘটনায় জড়িত নয়, এমন নিরীহ মানুষের বাড়ি বাড়ি হানা দিচ্ছে পুলিশ। আসামি গ্রেপ্তার করতে বারবার পুলিশ হানা দেওয়ায় গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামটির বেশির ভাগ পুরুষ তিন মাসের বেশি সময় ধরে বাড়ি ছাড়া। শুধু পুরুষরাই নয় অনেক শিক্ষার্থীরাও পলাতক।
বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) গোয়ালবাড়ি গ্রামের বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাজারে তেমন লোকজন নেই। বাজারের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ। যে দুই-একটি দোকান খোলা ছিল ওইসব ব্যবসায়ীরা বলেন, গোয়ালবাড়ি বাজার থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে রনশিবাড়ি হাটে জোড়া খুনের ঘটনায় পুলিশের করা মামলায় শুধুমাত্র গোয়ালবাড়ি গ্রামের ১২০০জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। অথচ ঘটনার দিন হাটে ১২-১৫টি গ্রামের বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া দুই ব্যক্তির বাড়ি গোয়ালবাড়ি গ্রামে। মামলার পর থেকেই পুলিশ আসামি ধরতে গোয়ালবাড়ি গ্রামে হানা দেওয়ায় মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। বাড়ির কিশোর, তরুণ ও পুরুষেরা বাড়ি ছাড়লেও বাড়িঘর দেখভালের জন্য শিশু ও নারীরা আছেন।
গোয়ালবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও কালিকাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, মাছ ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা আমিরুল ইসলাম একজন চিহ্নিত মাদকাসক্ত যুবক ছিল। মাদক কেনার জন্য টাকা না পেয়ে মানুষকে মারধর করার অনেক অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। গোয়ালবাড়ি ছাড়াও আশপাশের গ্রামের লোকজন তার ওপর চরম ক্ষিপ্ত ছিল। অনেক নারীর শ্লীলতহানিও করেছে আমিরুল। গোয়ালবাড়ি গ্রামসহ আশেপাশের গ্রামের মানুষরা আমিরুলের অন্যায়-অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। মাদক কেনার অর্থ না থাকলে আমিরুল ভিক্ষা করে যে চাল পেতো, সেই চাল বেচে মাদক কিনে সেবন করতো। বাজারের মধ্যে মাছ ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাককে হত্যার ঘটনার জেরে বাজারে থাকা লোকজন উত্তেজিত হয়ে গণপিটুনি দিয়ে তাকে হত্যা করেছে। কিন্তু ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন এবং আবার গণপিটুনির হাত থেকে বাঁচাতে গেছেন এমন লোককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ অবস্থায় পুলিশ কখন, কাকে গ্রেপ্তার করে, সেই ভয় গ্রামবাসীকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
গোয়ালবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমার ছেলে আব্দুল আওয়াল এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। দুই মাস হলো র্যাব সদস্যরা তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে। জামিন না পাওয়ায় এবার এইচএসসি পরীক্ষায় সে অংশ নিতে পারলো না। অথচ আমার ছেলে ওই ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয়। ওই দিন বিকেলে আব্দুর রাজ্জাককে হত্যার পর বিকেলে সে বাজারে দেখতে গিয়েছিল। লাশ দেখে তার খারাপ লাগায় কিছুক্ষণ পরেই সে বাড়িতে চলে আসে। রাজ্জাকের লাশ দেখার সময় একটা ভিডিওতে আমার ছেলেকে দেখতে পাওয়া যায়। ওই ভিডিও দেখে আমার ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু ওই দিন রাত ৭টার দিকে আমিরুল গণপিটুনিতে মারা যায়। তখন আমার ছেলে বাড়িতে ছিল। তাকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমার বড় ছেলেও গ্রেপ্তারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
বুলজান বিবি নামের এক বৃদ্ধা বলেন, ঘটনার দিন আমার ছেলে বিয়ের দাওয়াত খেতে আত্রাইয়ে গিয়েছিল। ওই দিন সন্ধ্যায় বাড়িতে এসে রনশিবাড়ি বাজারে গন্ডগোলের কথা শুনতে পেয়ে সেখানে যায়। আমিরুলকে যখন শত শত মানুষ মারধর করছিল তখন আমার ছেলে তাকে বাঁচানার চেষ্টা করছিল। এলাকার লোকজনই এই সাক্ষী দেবে। অথচ র্যাব সদস্যরা আমিরুলকে হত্যার ঘটনায় আমার ছেলেকেই গ্রেপ্তার করেছে।
গোয়ালবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, আমার ছোট ভাই গোলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আমিও গ্রেপ্তা আতঙ্কে গত তিন মাস ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমরা দুই ভাই বাড়িতে না থাকায় আমার বোরো ধান ও ভুট্টা ক্ষেত থেকে ফসল কাটতে না পারায় খেতেই নষ্ট হয়ে গেছে। আমন ধানও রোপন করতে পারছি না।
গোয়ালবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও স্কুল শিক্ষক আব্দুস সালাম বলেন, শুক্রবার রনশিবাড়ি হাটবারের দিনে আশপাশের ১২-১৫টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ থাকে। আব্দুর রাজ্জাক ও আমিরুল যেদিন খুন হয় সেদিনও হাজার হাজার লোক হাটে ছিল। পুলিশের কাছ থেকে আমিরুলকে ছিনিয়ে নিয়ে মারধর করে হত্যার সময় শুধু গোয়ালবাড়ি গ্রামের লোকজন সেখানে ছিল না। অন্য গ্রামের লোকজনও ছিল। অথচ পুলিশ শুধু গোয়ালবাড়ি গ্রামের লোকজনকে গ্রেপ্তারের জন্য বারবার অভিযান চালাচ্ছে। আমাদের কথা হলো প্রকৃতপক্ষে যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কেবল তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হোক। নিরীহ মানুষকে যেন হয়রানি করা না হয়।
বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম বলেন, রনশিবাড়ি হাটে গত ৪এপ্রিল পুলিশের কাছ থেকে আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। কয়েকজন পুলিশ সদস্যকেও আহত করা হয়। ওই ঘটনায় হওয়া মামলায় ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, কেবল তাদেরকেই গ্রেপ্তা করা হচ্ছে। ঘটনার দিনের ভিডিও দেখে আসামি গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কোনো নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে না।
নওগাঁর পুলিশ সুপার সাফিউল সারোয়ার বলেন, এমন ঘটনায় যেন ওই গ্রামের কোনো নিরীহ মানুষ পুলিশী হয়রানীর শিকার না হয় এবং গ্রেপ্তার আতঙ্কের ভীতি দূর করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাবো। এছাড়া গত ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের কোনো মানুষই অহেতুক পুলিশী হয়রানীর শিকার হওয়ার সুযোগ নেই। দ্রুতই ওই গ্রামের বাসিন্দাদের জীবনযাপন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে নওগাঁর পুলিশ যাবতীয় পদক্ষেপ নেবে।