আবদুল্লাহ আল-মামুন, ফেনী
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:০৪ এএম
আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:১৭ এএম
২০২৪ সালের আগস্টের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত শুকানোর আগেই ফের প্রবল ঢলে পানিতে ডুবেছে ফেনীর বিস্তীর্ণ জনপদ। চলতি বছরের ৮ জুলাই মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর ৪১টি স্থান ভেঙে পড়ে প্রবল পানির তোড়ে প্লাবিত হয় জেলার পাঁচটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এ বন্যায় কৃষি, অবকাঠামো, মৎস্য, প্রাণিসম্পদসহ বিভিন্ন খাতে ২৩৮ কোটি ৪০ লাখ ৪৬ হাজার ৪৩১ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এলাকাবাসী বলছে, বারে বারে হচ্ছি আমরা ক্ষত, এ ক্ষত দূর করতে আর কত সময় লাগবে?
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বন্যায় ২ হাজার ৭২৫.৬ হেক্টর জমির শস্য ও বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। এতে কৃষি খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৫ কোটি ২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রতিবছর একই ধরনের বন্যায় তারা ফসল হারাচ্ছেন, এতে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
বন্যার পানিতে ৪৪০ দশমিক ১০ হেক্টর হ্যাচারি ও ১,৬৭৭টি পুকুর ভেসে গেছে। এতে ৮ কোটি ৩৬ লাখ ২৬ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রাণিসম্পদ খাতেও দেখা গেছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিÑ মোট ৬৬ হাজার ৮২৫টি প্রাণীর মৃত্যু, যার মধ্যে অধিকাংশই মুরগি। ক্ষতির পরিমাণ ১ কোটি ৩২ লাখ ৭২ হাজার টাকা।
বন্যায় প্রবল পানির স্রোতে জেলার ৩১৯ দশমিক ৬ কিলোমিটার সড়ক এবং অন্তত ৬১টি ব্রিজ-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলজিইডি ও সড়ক বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, অবকাঠামোগত ক্ষতি ৮২ কোটি ৩০ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জেলায় ৪৩ দশমিক ৩৭৩ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে গেছে, এতে ৫৩ কোটি ৮৩ লাখ ৮৯ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এবারের বন্যায় জেলায় ৫১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২টি কলেজ ও ২টি মাদ্রাসা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩৬ লাখ টাকা। স্বাস্থ্য খাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৪টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। তার মধ্যে ৪টি হাসপাতাল ও ১০টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ ১৭ লাখ টাকা।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ক্ষতির পরিমাণ ১৪ কোটি ৫ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে রয়েছে ৩ হাজার ১৮৮টি গভীর, অগভীর ও হস্তচালিত নলকূপ এবং ২ হাজার ৭৪০টি স্বাস্থ্যসম্মত বাথরুম।
বন বিভাগের তথ্য মতে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৯ দশমিক ৫ হেক্টর বনায়ন ও ৮ হাজার ২৬টি নার্সারি। এতে ক্ষতির পরিমাণ ১৯ লাখ ৮৭ হাজার ২৩৪ টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, বন্যায় ৭৫ দশমিক ২০ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ ৪৪ লাখ ৩৪ হাজার টাকা।
২০২৪-এর আগস্টে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে ফেনী। এ বন্যার ভয়াবহতা ছাড়িয়ে গেছে অতীতের সব ইতিহাস। প্রাণ হারিয়েছিল ২৯ জন। এ ছাড়াও বন্যায় বিভিন্ন খাতেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
প্রতিবছর বন্যায় ফেনীর জনপদ ক্ষতির মুখে পড়লেও স্থায়ী ও টেকসই প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। শুধু ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নদী খনন ও বাঁধ সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে এই দুর্যোগ চলতেই থাকবেÑ এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফুলগাজীর মুন্সিরহাট এলাকার বাসিন্দা সাহেদ বলেন, বছর বছর এমন দুর্যোগে পড়ছি। পুকুর, ঘরবাড়ি, ফসলÑ সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
পরশুরামের অলকা গ্রামের রহিম উদ্দিন বলেন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ না হলে এই দুর্ভোগ কোনোদিন শেষ হবে না।
স্থানীয় উদ্যোক্তা শহীদুল ইসলাম বলেন, ভারতের উজান থেকে পানি এলে আমরা ডুবে যাই। নদীর নাব্যতা সংকট আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবহেলার কারণে প্রতিবছর এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা এর থেকে মুক্তি চাই।
ফেনী জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাহবুব আলম জানিয়েছেন, সব ধরনের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের জন্য বরাদ্দ এলে পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হবে। আংশিক ক্ষতির ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে সহায়তা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দপ্তর তাদের নিজ নিজ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। সে অনুযায়ী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে।