শ্রীমঙ্গলে ফটকী প্রাথমিক বিদ্যালয়
ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৫ ১৮:২১ পিএম
শিক্ষক প্রিয়াংকা দত্ত লাবণী।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল আশিদ্রোন ইউনিয়নের ফটকী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রিয়াংকা দত্ত লাবণী বছরের পর বছর সরকারি বিধিমালা উপেক্ষা করে চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রেষণে (ডেপুটেশন) থেকে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে তার মূল কর্মস্থলে শিক্ষক সংকট প্রকট হয়ে পড়েছে, ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম।
মৌলভীবাজার প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের জুন মাসের শেষ দিকে চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক) লাভলী দত্ত, প্রনবেশ কুমার চৌধুরী ও শিবানী দে ছুটিতে যান। ওই সময়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার লিখিত সুপারিশ ও প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শামসুর রহমান ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই এক লিখিত অফিস আদেশে শর্তসাপেক্ষে ফটকী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রিয়াংকা দত্ত লাবণীকে চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাময়িক সংযুক্তি প্রদান করেন। সংযুক্তি আদেশে শর্ত ছিল, সংযুক্তি প্রদানকৃত বিদ্যালয়ে ছুটিতে থাকা শিক্ষকরা যোগদানের সঙ্গে সঙ্গে এ আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে। কিন্তু ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ও পরবর্তী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ছুটিতে থাকা চন্দ্রনাথ স্কুলে শিক্ষকরা যোগদানের করলেও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অফিস আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চন্দ্রনাথ বিদ্যালয়েই পাঠদান চালিয়ে যান প্রিয়াংকা দত্ত লাবণী।
এর মধ্যে ২০২৪ সালের ২৮ মে তৎকালীন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খোরশেদ আলম তাকে সংযুক্তি মেয়াদ শেষ হওয়া পরও মূল বিদ্যালয়ে যোগদান না করায় কারণ দর্শানো নোটিস পাঠান। ওই বছরের ১ জুলাই দ্বিতীয় দফা নোটিস প্রদানের পর প্রিয়াংকা দত্ত লাবণী সেই নোটিসের জবাব দেননি। এ নিয়ে তদন্তের পর ওই বছরের ৭ আগস্ট তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয় এবং তাকে তিরস্কার দণ্ড প্রদান করলেও পরবর্তীতে আর কিছুই হয়নি।
সর্বশেষ, গত ৩০ জুন মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সফিউল আলম ওই শিক্ষকের সংযুক্তি আদেশ বাতিলের প্রস্তাবসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর পাঠানো হয়েছে।
সরেজমিন ফটকী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১১৯ জন। শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৫ জন, যার মধ্যে প্রধান শিক্ষককেও নিয়মিত অফিসের কাজে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকতে হয়। এক বা একাধিক শিক্ষক ছুটিতে থাকলে বাধ্য হয়ে শ্রেণি বন্ধ রাখতে হয় কিংবা একাধিক শ্রেণি একত্রে ক্লাস নিতে হয়। অথচ চন্দ্রনাথ স্কুলে বর্তমানে ১০ শ্রেণিকক্ষে ১৭ জন শিক্ষক রয়েছেন, যেখানে অতিরিক্ত শিক্ষক বসে থাকেন।
ফটকী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমীর কুমার ঘোষ বলেন, ডেপুটেশনে যাওয়া শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে মূল কর্মস্থল থেকে বেতন নিচ্ছেন। অফিস আদেশ লঙ্ঘন করে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এখনও ডেপুটেশনে রয়েছেন। ফলে ফটকী বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। উনি সাময়িক সময়ের জন্য ডেপুটেশনে গিয়ে আর ফিরেননি। আমি ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা বিদ্যালয়ের কল্যাণার্থে তাকে ফেরানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি আমাকে নানাভাবে হেনস্থা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন। তার অনুপস্থিতিতে বিদ্যালয়ের পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
শিক্ষক প্রিয়াংকা দত্ত লাবণী বলেন, আমি চন্দ্রনাথ স্কুল কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই এখানে রয়েছি। মূল কর্মস্থলে ফেরার চেষ্টা করলেও হুমকি-ধমকির কারণে সেখানে যেতে পারছি না। মন্ত্রণালয় থেকেও আমার সংযুক্তির দ্বিতীয় দফা অনুমোদন এসেছে।
চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক লাভলী দত্ত বলেন, ডেপুটেশনে আসা প্রিয়াংকা দত্ত নিজ ইচ্ছায় চন্দ্র্রনাথে রয়েছেন এমনটি নয়। আমাদের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের আদেশে এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই তিনি থেকেছেন। তার ডেপুটেশনের কাগজে কোনো তারিখ উল্লেখ ছিল না। তারপরও তিনি নিজ কর্মস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেও তাকে নানাভাবে হেনস্থা ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে জীবন হুমকির মুখে থাকায় প্রিয়াংকা মূল কর্মস্থলে যাচ্ছে না।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রিয়াংকা দত্ত লাবণীকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের এক আদেশে ২০২৩ সালের ১৩ জুন সাময়িক সময়ের জন্য শর্তসাপেক্ষে ডেপুটেশনে চন্দ্রনাথ সরকারি বিদ্যালয়ে দেওয়া হয়। এরপর তিনি আবার মন্ত্রণালয় থেকে পুনরায় ডেপুটেশনের আদেশ নিয়ে আসেন। আদেশে কোনো তারিখ না থাকায় জটিলতায় রয়েছে। আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সফিউল আলম বলেন, বিষয়টি আমার জানা আছে। ডেপুটেশন বাতিল চেয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। অফিস আদেশ না মানার কারণে এর আগে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে তাকে শোকজ করা হয়, পরবর্তীতে বিভাগীয় মামলায় তিরস্কার দণ্ডও দেওয়া হয়।