রাজু আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৫ ১০:১৩ এএম
রাজশাহীতে উৎপাদিত আম, মাছ ও মিষ্টি পানের জন্য সারা দেশে সুখ্যাতি রয়েছে। এরই মধ্যে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে রাজশাহীর মিষ্টি পান। মিষ্টি পান চাষ করে চলে এই জেলার লক্ষাধিক কৃষকের পরিবারের জীবন-জীবিকা। এই অঞ্চলে প্রায় দেড় লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মিষ্টি পান চাষে জড়িত। পান বিক্রির আয় দিয়েই অধিকাংশ পরিবারের সংসার চলে। তবে ২ মাস ধরে পানের বাজারে ধস নামায় চরম আর্থিক সংকটে হতাশ হয়ে পড়েছেন এ জেলার পান চাষিরা।
পান চাষিরা জানান, এবার বছরের শুরুর দিকে শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে পানবরজের। এরপর বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে বৃষ্টি ও রোগবালাইয়ের প্রভাব পড়ে পানবরজে। তার পরও ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারে ভালো দাম পাচ্ছেন না তারা।
আগে বড় আকৃতির পান বিড়া প্রতি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা ২৫-৩০ টাকায় নেমে এসেছে। মাঝারি ও ছোট পানের দাম একেবারে নগণ্য। মাঝারি ও ছোট আকৃতির পান গত মৌসুমের এ সময় বিক্রি হয়েছে ৩০-৪০ টাকা বিড়া। এবার দাম না পাওয়ায় অনেক পান চাষি গাছ থেকে ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছেন।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, মোহনপুর, পবা, বাগমারা, দুর্গাপুর উপজেলার বাজারসহ শ্যামপুর, আলীপুর, গোপালপুর, নারায়ণপুর, দাওকান্দি, কালীগঞ্জ ও পানানগর আড়তগুলোয় সপ্তাহে ছয় দিন পান কেনাবেচা হয়। এসব আড়তে প্রতিদিন প্রায় আড়াই থেকে তিন কোটি টাকার পান বেচাকেনা হয়। এসব উপজেলার উৎপাদিত পান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। শুধু তাই নয়, দেশের বাইরেও রপ্তানি হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে দাম না পাওয়ায় হতাশ ও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা।
দুর্গাপুর পৌরসভার রৈপাড়া মহল্লার পান চাষি মকিদ বলেন, আমার পুরনো একটি পানবরজ আছে। এটি আমাদের সংসারের প্রধান ভরসা। প্রতি বছর এক থেকে দেড় লাখ টাকা আয় হতো। এখন দাম না পেয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
একই এলাকার পান চাষি ইউসুফ আলী বলেন, বর্ষার শুরুতে পানবরজ পরিচর্যার জন্য ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছি। আড়তগুলোয় এখন কম দামে পান বিক্রি করে কিস্তি দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এনজিওর ঋণের কিস্তি দিয়ে হাতে কোনো টাকা-পয়সা থাকছে না। শ্রমিকের মজুরি দিতেও সমস্যা হচ্ছে।
পান চাষিদের দাবি, বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব পড়তে পারে। বাজারে অন্য পণ্যের দাম বাড়ছে। কিন্তু পানের দাম কমছে। আমরা ঋণের ফাঁদে পড়ে আর্থিক সংকটে নাকাল হচ্ছি।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দুর্গাপুর উপজেলায় ২ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে পানের চাষ হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষাকালে পানের উৎপাদন বাড়লেও দাম কমে যায়। শীত মৌসুমে চড়া দাম থাকে। তখন লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী বলেন, পান দীর্ঘমেয়াদি কাঁচা ফসল হওয়ায় দাম ওঠানামা করে। বর্ষাকালে বরজে পানের উৎপাদন বেশি হয়। তাই বাজারে সরবরাহ বেশি থাকে। এ সময় দাম কিছুটা কমে যায়। তিনি বলেন, পান চাষ লাভজনক ফসল হওয়ায় আমরা কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। বর্ষা মৌসুম শেষে পানের ন্যায্য দাম পান কৃষকরা, তখন লোকসান পুষিয়ে নিতে পারেন।