গোপালগঞ্জে সহিংসতা
গোপালগঞ্জ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৫ ২২:৫২ পিএম
গোপালগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রা ও সমাবেশ ঘিরে সহিংসতায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার চার দিনের মাথায় চারটি হত্যা মামলা হয়েছে। এদিকে গুলিবিদ্ধ রমজান মুন্সি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। সে বিষয়ে আরেকটি হত্যা মামলা হবে বলে জানা গেছে। এদিকে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনার পর জারি করা কারফিউ ও ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করে নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ ছাড়া কোটালীপাড়ায় নিরীহ মানুষকে হয়রানি ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে উপজেলা বিএনপি।
ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন ও সৎকার করা চারজনের মৃত্যুতে চার পুলিশ কর্মকর্তা গোপালগঞ্জ সদর থানায় গত শনিবার গভীর রাতে হত্যা মামলা চারটি করেন। এ চার মামলায় ৫ হাজার ৪০০ দুষ্কৃতকারীকে আসামি করা হয়েছে। গোপালগঞ্জ সদর থানার এসআই মো. আইয়ুব হোসেন রমজান কাজী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা করেন। মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা গেছে, গত বুধবার দুপুরে গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশ শেষে গাড়িবহর নিয়ে মাদারীপুরের উদ্দেশে রওনা দেন নেতাকর্মীরা। শহরের এসকে সালেহিয়া মাদ্রাসার কাছে পৌঁছলে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং দুষ্কৃতকারীরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এতে বাধা দেয়। এ সময় হামলাকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর গুলি ছোড়ে। এতে রমজান কাজী (১৭) গুলিবিদ্ধ হয়। স্থানীয়রা তাকে গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় ৮০০ থেকে ৯০০ জনকে আসামি করা হয়।
দীপ্ত সাহা (২৭) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এসআই মো. শামীম হোসেন অজ্ঞাতনামা ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার বিবরণে জানা গেছে, এনসিপির গাড়িবহরে হামলা চালায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ও দুষ্কৃতকারীরা। কলেজ মসজিদের পাশে মিলন ফার্মেসির সামনের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এটি প্রতিরোধ করতে গেলে হামলাকারীরা গুলি ছোড়ে। সেখানে দীপ্ত সাহা গুলিবিদ্ধ হন। তাকে গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় ১ হাজার ৫০০ দুষ্কৃতকারীকে আসামি করে মামলাটি করা হয়।
সোহেল রানা মোল্লা (৩০) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ জন দুষ্কৃতকারীকে আসামি করে মামলা করেন এসআই আবুল কালাম আজাদ। মামলার বিবরণে জানা গেছে, লঞ্চঘাট এলাকায় হোটেল রাজের সামনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দুষ্কৃতকারীরা এনসিপি নেতাদের ওপর হামলা চালায়। পুলিশ ও সেনাবাহিনী এগিয়ে গেলে গুলি ছোড়ে হামলাকারীরা। এ সময় সোহেল রানা মোল্লা (৩০) আহত হন। তাকে গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ইমন তালুকদার হত্যায় এসআই শেখ মিজানুর রহমান ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ দুষ্কৃতকারীকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেন। জানা যায়, ঘটনার দিন আসামিরা শহরের পুরাতন সোনালী ব্যাংকের সামনে এনসিপির গাড়িবহরে হামলা চালায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধা দিলে হামলাকারীরা গুলি ছোড়ে। গুলিবিদ্ধ হন ইমন তালুকদার। তাকে গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ পর্যন্ত গোপালগঞ্জে এসব ঘটনায় চারটি হত্যাসহ মোট ৮টি মামলা হয়েছে। আট মামলায় ৮ হাজার ৪০৮ জন দুষ্কৃতকারীকে আসামি করা হয়েছে। রবিবার (২০ জুলাই) পুলিশ ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এ নিয়ে গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়াল ৩০১ জনে।
কারফিউ ও ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার
এনসিপির সমাবেশ ঘিরে হামলা, সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনার পর জারি করা কারফিউ ও ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করে নিয়েছে প্রশাসন। তবে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলমান থাকবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। রবিবার সন্ধ্যায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামানের মিডিয়া সেলে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, রবিবার রাত ৮টার পর গোপালগঞ্জ জেলায় ১৪৪ ধারা ও কারফিউ বলবৎ থাকবে না। পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী নির্দেশনা দেওয়া হবে।
মানুষকে হয়রানির প্রতিবাদে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন
কোটালীপাড়ায় নিরীহ মানুষ হয়রানি ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে উপজেলা ও পৌর বিএনপি। রবিবার দুপুরে কোটালীপাড়ার ঘাঘর বাজারের দলীয় কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি এসএম মহিউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক আবুল বশার হাওলাদার ও পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওলিউর রহমান হাওলাদার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, পৌর বিএনপির সভাপতি ইউছুপ আলী দাড়িয়া, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক শেখ ফায়েকুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম হাওলাদার, সাংগঠনিক সম্পাদক ছলেমান শেখ, যুবদলের সদস্য সচিব মান্নান শেখ, ছাত্রদলের আহ্বায়ক লালন শেখ প্রমুখ।
এসএম মহিউদ্দিন বলেন, গত বুধবার উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা কোটালীপাড়া-পয়সারহাট সড়ক বন্ধ করে ওয়াবদার হাটে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। তারা সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছ কেটে সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় কোটালীপাড়া থানা পুলিশ ১৫৫ জুনের নাম উল্লেখ ও ১ হাজার ৫০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করে। এই মামলায় মানুষকে গ্রেপ্তারের নামে হয়রানি করা হচ্ছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
আবুল বশার হাওলাদার বলেন, জানতে পেরেছি এই মামলার অধিকাংশ আসামি সাধারণ মানুষ। তারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। তাহলে কেন তাদের আসামি করা হলো?
এ বিষয়ে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, জেলা আইনশৃঙ্খলার সভায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কাজ করার পাশাপাশি নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে পুলিশকে।